একাত্তরে যত অপরাধ ও আংশিক বিচার


১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার এ দেশীয় সহযোগীরা যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যাসহ গুরুতর সব অপরাধ সংঘটিত করে। এসব অপরাধের বিচারের লে ১৯৭৩ সালে একটি আইন প্রণীত হয়, যার নাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন। ওই আইনে অপরাধগুলোর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবেÑ

(১) মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ : যেমনÑ সংঘটিত হওয়ার স্থানের অভ্যন্তরীন আইন ভঙ্গ করে বা না করে যে কোনো বেসামরিক নাগরিককে হত্যা, উচ্ছেদ, দাস বানানো, নির্বাসিত করা, কারারুদ্ধ করা, অপহরণ, অবরোধ, নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা অন্যান্য অমানবিক আচরণ করা অথবা রাজনৈতিক, গোত্রগত, জাতিগত অথবা ধর্মীয় কারণে শাস্তি দেওয়া।

(২) শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ : যেমনÑ আগ্রাসনমূলক যুদ্ধের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, সূত্রপাত করা বা লিপ্ত হওয়া অথবা আন্তর্জাতিক চুক্তি, ঐক্যমত্য বা নিশ্চয়তাসমূহ লঙ্ঘন করে যুদ্ধ করা।

(৩) গণহত্যা : কোনো জাতীয়, গোত্রগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে নিচের যে কোনো কাজ, অংশত বা পুরোপুরি সংঘটিত করা বুঝাবে এবং অন্তর্ভুক্ত হবে, যেমনÑ

ক) দলের সদস্যদের হত্যা করা;

খ) দলের সদস্যদের দৈহিক বা মানসিক দিক থেকে গুরুতর তি করা;

গ) ইচ্ছাকৃতভাবে আংশিক বা পূর্ণভাবে দৈহিক ধ্বংস সাধনের পরিকল্পনা করে দলীয় জীবনে         আঘাত হানা;
ঘ) দলের মধ্যে জš§রোধ করার ল্েয ব্যবস্থা গ্রহণ;

ঙ) দলের শিশুদের জোর করে অন্য দলে স্থানান্তর করা;

(৪) যুদ্ধাপরাধ : যুদ্ধের আইন বা প্রথা ভঙ্গ করা, এতে অন্তর্ভুক্ত তবে সীমাবদ্ধ নয়, বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে বেসামরিক লোকদের হত্যা, তাদের প্রতি নির্দয় আচরণ অথবা ক্রীতদাসের মতো শ্রম বা অন্য যে কোনো কাজে নিয়োজিত করা; যুদ্ধবন্দি বা নাবিকদের হত্যা বা তাদের প্রতি নির্দয় আচরণ করা, জিম্মি ও বন্দিদের হত্যা করা, সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, ইচ্ছাকৃতভাবে নগর, শহর বা গ্রামের ধ্বংস সাধন করা অথবা সামরিক প্রয়োজনকে ন্যায্যতা দেয় না এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালানো;

(৫) ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনে বর্ণিত সামরিক সংঘর্ষে প্রয়োগযোগ্য যে কোনো মানবিক বিধিমালার লঙ্ঘন;

(৬) আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অন্য যে কোনো অপরাধ;

(৭) এ রকম অপরাধ সংঘটনের জন্য ষড়যন্ত্র ও সহায়তা করা;

(৮) এ ধরনের অপরাধ সংঘটন রোধ করতে ব্যর্থ করা বা এর সঙ্গে সহযোগিতা করা।

একাত্তরের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নিয়ে বর্তমান সরকার জনদাবি ও নির্বাচনপূর্ব ওয়াদা রার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করেছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এ পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দিকে এগুবে না সরকার। তারপরও সরকার প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে। তবে এ প্রশংসা চরম নিন্দায় পরিণত হবে যদি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগটি সফল না হয় এবং এ েেত্র সরকারের দিক থেকে কোনো গাফিলতি হয়েছে বলে জনগণের কাছে মনে হয়। এ আশঙ্কা এ কারণেই মনে জাগে যে, এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারের েেত্র শুরু থেকেই যে ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল, তেমনটি নেওয়া হয়নি। সরকার ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বারবার আশার বাণী শোনালেও গত ৯ মাসে একটি অভিযোগও গঠন না হওয়ায় জনমনে সংশয় কাটছে না। বিভিন্ন স্থান ঘুরে তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটররা ‘যথেষ্ট স্যা-প্রমাণ মিলেছে’ বলে বারবার দাবি করলেও ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করছেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গতি নিয়ে হিতাকাক্সী মহল থেকেও এরইমধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান সম্প্রতি আেেপর সুরে বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের যখন নাকি দৌড়ানোর কথা, তখন এটি খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দেরিতে ােভ প্রকাশ করে এলডিপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য অলি আহমেদ বীরবিক্রম গত ২৩ নভেম্বর বলেন, ‘দুই বছরে সরকার কোনো যুদ্ধাপরাধীকে শাস্তি দিতে পারেনি। কেবল গ্রেপ্তারের নামে তাদের ওপর মনস্তাত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে মাত্র। অনেক চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ধরা হচ্ছে না বলে দেশের মানুষের মুখে মুখে কথা হচ্ছে।’ সহযোগী একটি দৈনিকে গত ৮ ডিসেম্বর অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন মন্তব্য করেছেন, ‘তদন্ত সংস্থা বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে যেভাবে আশা জাগানোর কথা বলেছে, সেভাবে কাজের গতি নেই। যেভাবে কাজ এগুচ্ছে তাতে বিচার নিয়েই এখন আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। বিচারকাজ আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।’ মতাসীন দল আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াও প্রায় একই রকম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে কাজ করার সুবাদে প্রায়ই কথা হয় এ বিষয়ে গবেষণারত বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গেও। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন)  কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে কাউকেই তেমন আশাবাদী মনে হয় না। গবেষকদের কেউ কেউ এমনও বলেন, এ গতিতে চললে আগামী তিন বছরেও এ বিচার শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ হতাশা ও সংশয়ের কারণটাও খুব অস্পষ্ট নয়। আমরা ল করেছি, ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রায় চার মাস পর গত ১৫ জুলাই এর কার্যবিধি প্রকাশ করা হয় প্রজ্ঞাপন আকারে। এ কার্যবিধি না থাকায় ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন তাঁদের কর্মপরিধি ও পদ্ধতি নিয়ে ছিলেন অন্ধকারে। ফলে কার্যক্রম চলে এলোমেলোভাবে। আবার দেরিতে কার্যবিধি তৈরি হলেও অনেক বিষয় তাতেও অস্পষ্ট থেকে যায়। বিশেষ করে তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েই দেখা দেয় সংশয়। অভিযোগ দাখিল করার আগে কাউকে গ্রেপ্তার করা আইনসংগত কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই কার্যবিধির ত্র“টি নিয়ে কালের কণ্ঠে গত ২০ জুলাই একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয় আমারই লেখা। অবশেষে গত ২৮ অক্টোবর সংশোধিত কার্যবিধি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু অস্পষ্টতা ও ত্র“টি দূর করে সংশোধিত এই কার্যবিধি প্রণয়ন করতেও লেগে যায় আরো প্রায় সাড়ে তিন মাস। ট্রাইব্যুনাল গত ২৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে পুরনো হাইকোর্ট ভবনে। এ ভবনে স্থান সংকুলান না হওয়ায় গত ৪ জুলাই বেইলি রোডে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের জন্য নতুন কার্যালয় স্থাপন করা হয়।
বিধি সংশোধন করে তদন্ত সংস্থার কোনো সদস্যকে কো-অর্ডিনেটর মনোনীত করার বিধান যুক্ত করা হলেও সরকার এখনো কাউকে কো-অর্ডিনেটর মনোনীত করেনি। ফলে তদন্ত সংস্থায় সমন্বয়হীনতা চোখে পড়ে। সমন্বয়ের অভাব ল করা যায় প্রসিকিউটরদের মধ্যেও। প্রসিকিউটরদের অনেককেই পেশাগত কাজে যতটুকু ব্যস্ত দেখা যায়, ট্রাইব্যুনালের কাজে তেমনটা দেখা যায় না। একটি সুসংগঠিত একক টিম হিসেবে প্রসিকিউশনের সক্রিয়তা চোখে পড়ে না। এ ছাড়া এখনো গঠন করা হয়নি কোনো গবেষণা সেল। অথচ এ ধরনের বিচারের েেত্র এটি অপরিহার্য। তদন্ত সংস্থায় একজন গবেষককে [মেজর (অব.) এ এস এম সামছুল আরেফিন] রাখা হলেও প্রসিকিউটর হিসেবে ওই রকম কোনো আইনজীবীকে রাখা হয়নি। এ বিষয়টি সবারই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা দরকার যে, শুধু প্রচলিত ফৌজদারি আইনের বিশেষ জ্ঞান দিয়ে এ ধরনের মামলা যথাযথভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ বিচারের েেত্র গবেষণার কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই আইনজীবীদের মধ্যেও যাদের গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং বিভিন্ন দেশে এসব অপরাধের বিচারের বিষয়ে চর্চা আছে, সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন, সেই রকম ব্যক্তিদের এতে যুক্ত করা দরকার। ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী ও প্রসিকিউটরদের যথাযথ প্রশিণের কোনো উদ্যোগও এখনো ল করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে জাতিসংঘের প থেকে সহযোগিতা দেওয়ার আগ্রহের কথা বিভিন্ন সময়ে জানা গেছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো তেমন কিছু চোখে পড়ছে না। এই বিচার প্রক্রিয়ায় তদন্তকারী ও প্রসিকিউটরদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা দরকার সংশ্লিষ্ট গবেষকদেরও। সে রকম কোনো উদ্যোগও এখনো নেওয়া হয়নি। যদিও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে গবেষকদের কেউ কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে নানা তথ্য ও দলিল তদন্ত সংস্থা কিংবা প্রসিকিউশনকে দিয়েছেন।
সংবাদকর্মী হিসেবে আর দশটি ঘটনার মতো এ বিচার কার্যক্রম নিয়েও জন-প্রতিক্রিয়া জানার সুযোগ সাধারণের চেয়েও আমরা কিছুটা বেশিই পেয়ে থাকি। একাত্তরের ঘাতক-সহযোগীদের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার েেত্র সরকারের আন্তরিকতা ও উদ্দেশ্য নিয়েও নানা রকম কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। আমরা সরকারের আন্তরিকতা কিংবা উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ পোষণ না করেও বলতে চাই, এই বিচারের েেত্র সুচিন্তিত ও সমন্বিত পদপে না নিলে যে কোনো অনাকাক্সিত পরিণতি হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। আর তেমন কিছু ঘটলে জনমনে কী প্রতিক্রিয়া হবে সেটি তো বলাই বাহুল্য; বরং বলা যায়, জাতির কলঙ্কের আর সীমা থাকবে না।
এদিকে সরকার ও ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বশীল অনেকের কথা ও বাস্তবতায়ও মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে জনগণের কাছে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত কারো কারো সম্পর্কে এমন কথাবার্তা বলেছেন, যা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। এ নিয়েও কথা উঠছে নানা রকম। কাজেই বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়ার সময়ও সংশ্লিষ্টদের আরো সতর্ক দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
শুরুতে ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেল ঘোষণা করা হলেও কিছু জটিলতা ও বিতর্কের কারণে পরে সাতজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নিয়োগপ্রাপ্ত সব আইনজীবীও (প্রসিকিউটর) সমন্বিতভাবে কাজ করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের সূচনা থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতা ও বিপত্তি লেগে আছে, যার প্রভাবে তদন্ত ও বিচারকাজের গতি মন্থর বলে মনে করছেন পর্যবেকরা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগে এ পর্যন্ত জামায়াতের পাঁচ নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও আবদুল কাদের মোল্লাকে আটক করা হয়েছে। কারো বিরুদ্ধেই এখনো চূড়ান্ত অভিযোগ পেশ করা হয়নি ট্রাইব্যুনালে। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পরিচিত নেতৃস্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো পদপে নেওয়া হয়নি। এসব বিষয়ে দ্রুত পদপে না নিলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s