বজ্রে দূষণ, দূষণে বজ্র

 

দেড়-দুই দশক আগেও বজ্রপাত মানুষের কাছে তেমন আতঙ্কের বিষয় ছিল না। কিন্তু ইদানীং ঝড়ের মৌসুমে বাজ পড়ে মানুষের প্রাণহানির ঘটনা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দেশে বজ্রপাত এবং এর দরুন প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দিন দিনই বাড়ছে। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে লক্ষ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রাণহানির সংবাদ সংগ্রহ করার মাধ্যমেই তাদের দায়িত্ব সারছে। বজ্রপাত বাড়ার কারণ জানা বা প্রতিরোধের উপায় বের করার বিষয়ে গবেষণাও নেই কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের।
বাংলাদেশে বজ্রপাত নিয়ে কারো মাথাব্যথা না থাকলেও উন্নত বিশ্বে এ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে বিস্তর। এসব গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বায়ুদূষণের সঙ্গে বজ্রপাতের নিবিড় সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। গবেষকরা লক্ষ করেছেন, বজ্রপাত একদিকে যেমন বাতাসে দূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে, তেমনি আবার বায়ুদূষণের ফলে বাড়ছে বজ্রপাতের হার ও তীব্রতা। এ যেন দূষণের এক নয়া দুষ্টচক্র।
টেঙ্াসের এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী নাসার কারিগরি সহায়তায় উপগ্রহের সাহায্যে গবেষণা চালিয়ে দেখতে পেয়েছেন, বজ্রপাতের পরপরই ট্রপসফিয়ারে (বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তর) প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন অঙ্াইড (নাইট্রিক অঙ্াইড ও নাইট্রোজেন ডাইঅঙ্াইড) তৈরি হয়। কার্বন ডাইঅঙ্াইড বা কার্বন মনোঙ্াইডের চেয়েও বিষাক্ত এ নাইট্রোজেন অঙ্াইড রূপান্তরিত হয়ে যায় ওজোন গ্যাসে। সেই গ্যাস বাতাসের এমন একটি স্তরে জমে থাকছে যে, এর ফলে দূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এ বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণাপত্রে বলেছেন, ‘বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট দূষিত অঙ্াইড পরিবেশ দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। যানবাহনের কারণে দূষণ বা শিল্পদূষণের চেয়ে বজ্রপাতজনিত দূষণের মাত্রা অনেক বেশি।’ ওই গবেষকদলের প্রধান ড. রেনি ঝাংয়ের মতে, ‘বজ্রপাত যেমন বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে, তেমনি আবার দূষণের ফলে বাড়ছে বজ্রপাতের হার।’ তবে কেন এমন হচ্ছে তা জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
একই বিষয়ে গবেষণা করেছেন মার্কিন বিজ্ঞানী এন এম টমসন ও তাঁর সঙ্গীরা। বেলুন উড়িয়ে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। ঘন ঘন বৃষ্টিতেও মেঙ্েিকা সিটির বায়ুদূষণ কেন কমছে না তা পরীক্ষা করে টমসন বলেছেন, ‘বৃষ্টির পানি বায়ুমণ্ডলের দূষিত পদার্থকে ধুয়ে দিচ্ছে ঠিকই; কিন্তু প্রতিবার বাজ পড়ার পরই বাতাসে দূষণ বহু গুণ বেড়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। কারণ মেঘের ঘর্ষণে বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন অঙ্াইড তৈরি হচ্ছে। সেটা ওজোনে রূপান্তরিত হয়েই সমস্যার সৃষ্টি করছে।’
নাসার মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে বজ্রপাত নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানী উইলিয়াম কোশাক। তিনিও বলেছেন, ‘বজ্রপাত হচ্ছে ট্রপসফিয়ারের উপরিস্তরে নাইট্রোজেন অঙ্াইড তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আর এ অঙ্াইড বায়ুমণ্ডলে ওজোন ও হাইড্রঙ্েিলর ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখায় আমাদের জলবায়ুকেও অনেকাংশে প্রভাবিত করে।’
বজ্রপাতের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে ওজোন গ্যাসের পরিমাণ বাড়ার সম্পর্কের বিষয়টি ধরা পড়েছে নাসার সাহায্যপুষ্ট আরো কয়েকটি গবেষণায়। ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক রিসার্চের (এনসিএআর) বিজ্ঞানী ডেভিড এডওয়ার্ডস ও তাঁর সঙ্গীরা কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে দেখতে পেয়েছেন, বায়ুস্তরের কাছাকাছি যেখানেই ওজোনের পরিমাণ বেশি, সেখানেই বজ্রপাত হয়েছে বেশি মাত্রায়। নাসার বিশেষ মহাকাশযানে চেপে এ সমীক্ষা চালানোর পর এডওয়ার্ডস তাঁর গবেষণাপত্রে বলেছেন, ‘দাবানলে যে পরিমাণ ওজোন তৈরি হয়, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি তৈরি হয় বজ্রপাতে। বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে ওজোনের পরিমাণ বাড়ার জন্য মূলত বজ্রপাতই দায়ী।’ বজ্রপাত ও বায়ুদূষণের এ দুষ্টচক্র কিভাবে ভাঙা যায়, সেটাও অবশ্য খতিয়ে দেখছে নাসা।
বিশ্বজুড়েই বজ্রপাতে প্রাণহানি বাড়ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, ২০১০ সালের ৪ অক্টোবর ভারতের মহরাষ্ট্র রাজ্যের নাগপুর অঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় বজ্রপাতে ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। আহত হয় আরো ২৭ জন। আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, ২০০৭ সালের মার্চ থেকে মধ্য আগস্ট পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসাবেই ৮২ জন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর অনুযায়ী ২০০৬ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে ভারতের কেবল উড়িষ্যাতেই ৩০ জনের মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে। একই অবস্থা ইউরোপ-আমেরিকায়ও। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বছরে ৭৫ থেকে ১০০ জনের মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে। ২০০৩ সালে সে দেশে বজ্রপাতে মারা যায় পাঁচ শতাধিক মানুষ। আমাদের দেশে সাধারণত গরিব মানুষ বজ্রপাতের শিকার হলেও ইউরোপ-আমেরিকায় নভোচারীরাও রেহাই পাচ্ছেন না এ প্রাকৃতিক ঘাতকের হাত থেকে। বজ্রপাতের হাত থেকে মহাকাশযান ও নভোচারীদের রক্ষা করতে তাই এক বিরাট প্রকল্প হাতে নিয়েছে নাসা।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টমাস ডবি্লউ স্মিডলিন তাঁর এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, ঝড়, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টিতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে বাংলাদেশে। বজ্রপাতে বছরে দেড় শর মতো লোকের প্রাণহানির খবর পত্রপত্রিকায় ছাপা হলেও স্মিডলিনের মতে, প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা ৫০০ থেকে এক হাজার। এ দেশে বজ্রপাত বেশি হয় মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সময়ে। এ সময় প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাজ পড়ে ৪০টি। ২০০৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি বাড়িতে বজ্রপাতে ৯ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে স্মিডলিনের গবেষণাপত্রে।
সোমবার বজ্রপাতে বাংলাদেশের ১৮টি জেলায় ৩৫ জনের মৃত্যু ঘটে। দেশে বজ্রপাতে একদিনে প্রাণহানির সংখ্যা এটি সর্বোচ্চ। এদিন আহত হয় অর্ধশতাধিক লোক। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়ই মারা যায় ৯ জন। চারজন মারা যায় রাজশাহীতে। গত শনি ও রবিবার ভোলা, জামালপুর, জয়পুরহাট, মেহেরপুর, নেত্রকোনা, নরসিংদী, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে বজ্রপাতে স্কুলছাত্রী, গৃহবধূসহ ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৬ মে কিশোরগঞ্জে একই সময়ে ছয়জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বজ্রপাত।
২০০৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার কমলাবাড়ী গ্রামে বজ্রপাতে এক পরিবারের পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে ৩ জুন ভোলায় মারা যায় তিনজন। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মতিননগরে ২০০৮ সালের ৩ জুন বৃষ্টির সময় বজ্রপাতে কাঁচাঘরে অবস্থানরত একটি পরিবারের চার সদস্য মারা যায়। ৪ জুন রাতে নীলফামারী, বাগেরহাট ও জামালপুরে মারা যায় সাতজন। সে বছরের ২৪ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, মেহেরপুর, নাটোর, পাবনা, বাগেরহাট, নড়াইল ও নেত্রকানা_এ আট জেলায় বজ্রপাতে ১৭ জন নিহত হয়। ২৭ মে বজ্রপাতে কুমিল্লায় এক পরিবারের দুজনসহ পাঁচ জেলায় ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে। বিভিন্ন বার্তা সংস্থা ও পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সে বছর ১৮ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ১৮ দিনে দেশের নানা স্থানে বজ্রপাতে ৫১ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে ২০ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ দিনে দেশে বজ্রপাতে ২১ জনের মৃত্যুর খবর জানা যায়। এ হিসাবে ৩৩ দিনে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫ জন। ২০০৭ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আড়াই মাসে বজ্রপাতে দেশে ৩৫ জনের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়।
২০০৪ সালের ২২ জুন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক নিউজের এক নিবন্ধে বজ্রপাতকে আবহাওয়াজনিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলেই গণ্য করতে রাজি নয়।
যোগাযোগ করা হলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর কমিউনিকেশনস ও মিডিয়া স্পেশালিস্ট সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, বজ্রপাত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি দুর্যোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মাত্র। তিনি জানান, বজ্রপাত নিয়ে কোনো গবেষণা ব্যুরোর নেই। তবে ব্যুরোর প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে। আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে যে ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে তেমনটি নেওয়া কঠিন।’
স্পারসোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, বজ্রপাত নিয়ে কোনো গবেষণা নেই তাঁদেরও।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. শহীদুল ইসলাম জানান, বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়াই তাঁদের কাজ। এ ছাড়া বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর পত্রিকায় বেরোলে সেটি তাঁরা সংগ্রহ করেন। এর বাইরে এ নিয়ে কোনো গবেষণা বা কাজ অধিদপ্তরের নেই।
সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রের (এসএমআরসি) সহকারী গবেষণা কর্মকর্তা আবুবকর আবদুল্লাহর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি। পরে একজন বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বজ্রপাত-সংক্রান্ত উপাত্ত সংগ্রহের একটি প্রকল্প আছে এসএমআরসির। এর বেশি কিছু বলতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Environment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s