আলবদর থেকে ধনকুবের

চট্টগ্রাম শহরের নন্দনকানন টিঅ্যান্ডটি অফিসের পেছনের সড়কে এক হিন্দু পরিবারের মালিকানাধীন মহামায়া ভবনটি ১৯৭১ সালে আলবদর বাহিনী কেড়ে নিয়ে তার নাম দিয়েছিল ডালিম হোটেল। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত ডালিম হোটেলই ছিল চট্টগ্রামে আলবদর ও রাজাকারদের অন্যতম নির্যাতন কেন্দ্র। এ বন্দিশিবির ও নির্যাতন কেন্দ্রে আলবদরদের হাতে নির্যাতনের শিকার ও খুন হয়েছেন চট্টগ্রামের অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালি। আর একাত্তরে ইসলামী ছাত্রসংঘের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি হিসেবে সেখানকার আলবদরেরও প্রধান ছিলেন মীর কাসেম আলী। ওই সময় তাঁর নেতৃত্বাধীন আলবদর বাহিনীর নির্যাতনের স্মৃতি স্মরণ করে আজও শিউরে ওঠেন চট্টগ্রামের অনেক মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালির বিরুদ্ধে মীর কাসেম আলীর নৃশংসতা এতটাই তীব্র ছিল যে একাত্তরের শেষ দিকে তাঁকে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদকের পদে বসানো হয়েছিল।
মীর কাসেম আলীর জন্ম সাধারণ এক সরকারি কর্মচারীর ঘরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পালিয়ে লন্ডন হয়ে চলে গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। সেখানে থেকেই সংগঠিত করেন স্বাধীনতাবিরোধীদের। নানা উপায়ে কামিয়ে নেন প্রচুর অর্থ। বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম প্রধান ধনাঢ্য ব্যক্তি। তার মালিকানাধীন কেয়ারী গ্র“পের সহস্রাধিক এপার্টমেন্ট ও বিপনীবিতান রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে; আছে সমুদ্রগামী জাহাজ। ইসলামী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা। ব্যাংকটির বিরুদ্ধে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন সময়ে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু নিজে সাংবাদিকদের বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক তার লাভের চার শতাংশ ব্যয় করে জঙ্গিদের পেছনে। মীর কাসেম আলী বর্তমানে দিগন্ত টিভির চেয়ারম্যান এবং ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন)। এ ছাড়া রাবিতা আল ইসলামী, ইবনে সিনা ট্রাস্টের মতো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠে তার হাতেই।
মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুদ্দিন চৌধুরী একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর ধরা পড়েছিলেন আলবদর বাহিনীর হাতে। তার পর থেকে ওই কুখ্যাত ডালিম হোটেলে তাঁর ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলাপকালে তিনি জানিয়েছেন, তাঁকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলের একটি কক্ষে অন্য বন্দিদের সঙ্গে চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল। ওই সময় অন্য বন্দিদের সঙ্গে তাঁকেও প্রচণ্ড মারধর করে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্য আদায় করার চেষ্টা চালায় আলবদররা। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক দ্য পিপলস ভিউর ডেপুটি এডিটর নাসিরুদ্দিন বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের জানান, ডালিম হোটেলে সারাক্ষণ চলত বন্দিদের ওপর নির্যাতন আর নির্যাতিতদের চিৎকার-কান্নাকাটি। ওই নির্যাতনের মূল হোতা ছিলেন মীর কাসেম আলী।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই নির্যাতন কেন্দ্রে ২৩ দিন বন্দি ছিলেন তখনকার চট্টগ্রাম জয় বাংলা বাহিনীর উপপ্রধান মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। একাত্তরের ২৩ নভেম্বর চট্টগ্রামের কদমতলীর বাড়ি থেকে তাঁকে ধরে নিয়েছিল আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মুক্তি পান। নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে জাহাঙ্গীর আলম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ”মীর কাসেম যখন ডালিম হোটেলে আসত, তখন বদর সদস্যরা পাহারায় থাকা অন্যদের বলত, ‘কাসেম সাব আ গেয়া, তোম লোক বহুত হুঁশিয়ার।’ সে আসার পর বন্দিরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন।”
গণতন্ত্রী পার্টির নেতা সাইফুদ্দিন খান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা সাংবাদিকদের বলেছেন। একাত্তরের ৩ নভেম্বর একদল রাজাকার তাঁকে তাঁর বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ওই ডালিম হোটেলে। একাত্তরের ১৭ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডালিম হোটেলে আলবদর বাহিনীর হাতে চরমভাবে নির্যাতনের শিকার হন তিনি। সাইফুদ্দিন খানের স্ত্রী ও মহিলা পরিষদ নেত্রী নুরজাহান খান সাংবাদিকদের জানান, একাত্তরের ১৭ নভেম্বর ভোর ৪টার দিকে একদল রাজাকার-আলবদর তাঁদের বাসায় গিয়ে সাইফুদ্দিন খানকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের বেশির ভাগই ছিল মুখোশ পরা। তবে একপর্যায়ে তাদের দলনেতা মুখোশ খুলে ফেলায় মীর কাসেম আলীকে চিনে ফেলেন তিনি।
১৯৭১ সালের ২ আগস্ট চট্টগ্রাম শহর ইসলামী ছাত্রসংঘের উদ্যোগে মুসলিম ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সমাবেশে সভাপতির ভাষণে মীর কাসেম আলী বলেন, ‘গ্রামগঞ্জের প্রতিটি এলাকায় খুঁজে খুঁজে শত্রুর শেষ চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে।’
১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের শীর্ষ নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ এবং সাধারণ সম্পাদক মীর কাসেম আলী এক যুক্ত বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘এ দেশের ছাত্র-জনতা ১৯৬৫ সালের মতো ইস্পাতকঠিন শপথ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করে যাবে।’

Advertisements

Leave a comment

Filed under War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s