মুসলিম দেশের যত ভাস্কর্য

বছর কয়েক আগে এক ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে। একদল (মাত্র শ’ দেড়েক) সাম্প্রদায়িক উগ্রপন্থির আপত্তির মুখে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে ‘অচিন পাখি’ নামের নির্মাণাধীন বাউল ভাস্কর্য ভেঙে সরিয়ে ফেলে সরকার। এ নিয়ে সঙ্গত কারণেই দেশের নানা স্থানে নিন্দা-প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন অসাম্পদায়িক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। অন্যদিকে সা¤প্রদায়িক মৌলবাদী ুদ্র গোষ্ঠীটি হুঙ্কার ছাড়েÑ তারা মতায় গেলে নাকি দেশের সব ভাস্কর্য, স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার ভেঙে ফেলবে; নিভিয়ে দেবে ‘শিখা চিরন্তন’ ও ‘শিখা অনির্বাণ’।
বাংলাদেশে স্বার্থান্বেষী ধর্ম ব্যবসায়ী এ চক্রটি বরাবরই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে আসছে। অথচ দেশে দেশে স্থাপত্য-ভাস্কর্য নির্মাণে মুসলমানদের অবদানও রয়েছে যথেষ্ট। এ উপমহাদেশের অধিকাংশ খ্যাতনামা স্থাপত্যই মুসলমান শাসকদের সৃষ্টি। শুধু তা-ই নয়, ইরান, ইরাক, মিসর, সিরিয়াসহ অনেক মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান জঙ্গিরা যখন বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করে, তখন ইরানের পার্লামেন্ট তার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল।
যে যুক্তি দিয়ে এ দেশের মৌলবাদীরা ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে, সে যুক্তিতে কিন্তু মানুষের ছবি তোলাটাও ঠিক নয়। অথচ বাস্তবে ওই মৌলবাদীরাও ছবি তুলছে নিজের স্বার্থে। এমনকি কট্টর রণশীল মুসলিম দেশ সৌদি আরবে খেলনা পুতুল বিক্রি হয় বৈধভাবেই। ওই পুতুল সে দেশে খুবই জনপ্রিয়।

ইরান, মিসর, ইরাকের জাদুঘরে অসংখ্য ভাস্কর্য এবং প্রাচীন শাসক ও দেব-দেবীর মূর্তি তো রয়েছেই, সেসব দেশে উš§ুক্ত স্থানে রয়েছে অনেক ভাস্কর্য। ইরানে আছে একটি বিশাল স্বাধীনতাস্তম্ভ, যার নাম ‘আজাদী’। এ স্থাপত্যটির ডিজাইনার হোসেন আমানত একজন মুসলমান। কবি ফেরদৌসী, ওমর খৈয়াম, পারস্যের নেপোলিয়ন বলে খ্যাত নাদির শাহ্র মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিদের ভাস্কর্য রয়েছে ইরানে। মাশহাদ নগরীতে ভাস্কর্যসংবলিত নাদির শাহ্র সমাধিসৌধটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।
ইরানের রাজধানী তেহরানে দু’বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় সমকালীন ভাস্কর্য প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা। সর্বশেষ ও পঞ্চম দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীটি হয়েছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে। এতে ১০৫ জন শিল্পীর ১১২টি ভাস্কর্য ঠাঁই পায়। তেহরান মিউজিয়াম অব কনটেম্পরারি আর্টসে আয়োজিত এ প্রদর্শনী স্পন্সর করে সে দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
ইরানের মাজানদারান প্রদেশে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় বালির তৈরি ভাস্কর্য প্রদর্শনীর। এটি একটি উৎসব, যার নাম স্যান্ড স্কালপচার ফেস্টিভ্যাল। ২০০৫ সালের ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর মাজানদারান প্রদেশের বাবলসার নগরীতে অনুষ্ঠিত হয় বালির তৈরি ভাস্কর্যের প্রথম প্রদর্শনী। দ্বিতীয়বার হয় ২০০৬ সালের ৬ থেকে ২১ আগস্ট বাবলসার, সারি ও রামসার নগরীতে। এতে ২৭৫টি ভাস্কর্য ঠাঁই পায়। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে মাজানদারান প্রদেশে বালির তৈরি ভাস্কর্যের সপ্তাহব্যাপী তৃতীয় জাতীয় প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রভিন্সিয়াল কালচার অ্যান্ড ইসলামিক গাইডেন্স ডিপার্টমেন্টের সহযোগিতায়।
পিরামিডের জন্য দুনিয়াজোড়া খ্যাতি মিসরের। বিরাটত্বের দিক থেকে বিখ্যাত হলো জোসার বা স্টেপ (সোপান) পিরামিড ও গিজা পিরামিড। পাথরের তৈরি স্ফিংসের মূর্তিসংবলিত গিজা পিরামিড সারা দুনিয়ার পর্যটকদের অতি প্রিয়। শুধু ইসলাম-পূর্বই নয়, অনেক অনেককাল আগের তথা খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার অব্দের এসব মূর্তি মিসরের মুসলমানরা ধ্বংস করেনি, গর্বের সঙ্গে রা করে। আফগানিস্তানে যে তালেবানরা বামিয়ানের জগিদ্বখ্যাত বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করেছে তারা মৌলবাদী, বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সঙ্গে তাদের মিল নেই। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে মাহমুদ মোখতারের বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘‘ইজিপ্ট’স রেনেসাঁ’’।
ইরাকেও আছে অনেক ভাস্কর্য। বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে ডানার ভাস্কর্যটি সবার নজর কাড়ে। বাগদাদের পাশে আল-মনসুর শহরে আছে মনসুরের একটি বিশাল ভাস্কর্য। আছে অনেক সাধারণ সৈনিকের ভাস্কর্য। সাদ্দাম হোসেনের বিশাল আকারের ভাস্কর্যটি মার্কিন আগ্রাসনের পর ভেঙে ফেলে সাদ্দামের রাজনৈতিক প্রতিপ, যারা মার্কিন বাহিনীর মদদপুষ্ট। এটা ভাঙা হয় রাজনৈতিক কারণে, ধর্মীয় কারণে নয়।
My another post on same topic published on December, 2008 in the daily Samakal titled

‘ভাস্কর্য নিয়ে এত গা-জ্বালা নেই সৌদি আরবেও’

আবার সেই মৌলবাদী কালো থাবা। ওদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত ‘বলাকা’। সুন্দর কিছুকেই যেন সহ্য নয় ওদের। নিরীহ সুন্দর একটি বকের ভাস্কর্যকেও সহ্য করতে পারেনি ওরা। গত শনিবার রাতের আঁধারে খুন্তি-শাবল নিয়ে দল বেঁধে ওরা হামলে পড়ে ভাস্কর্য ‘বলাকা’র ওপর। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলে বিমান অফিসের সামনে অনিন্দ্য সুন্দর ভাস্কর্যটিকে ওরা ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে।

নিপুণ হাতে গড়া অনুপম ভাস্কর্যটির ছবি দেখেই মনে পড়ে গেল আরেকটি ভাস্কর্যের কথা। সেটি আছে প্রচন্ড-রক্ষণশীল মুসলিম দেশ সৌদি আরবের বাণিজ্যিক রাজধানী জেদ্দা নগরীতে। জেদ্দার হামরায় উটের ওই দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যটির সঙ্গে আমাদের ঢাকার ভাস্কর্য বলাকার যেন খুবই মিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, উগ্র ওহাবি মতবাদের চারণভূমি সৌদি আরবের মুসলমানরাও আমাদের দেশের মৌলবাদীদের মতো জেদ্দায় উটের ভাস্কর্যটির ওপর হামলে পড়েনি কখনো। অথচ এ কথা কে না জানে, দেশে দেশে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের এমন বাড়-বাড়ার পেছনে আছে সৌদি আরবসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের নানা মহলের জোগান দেওয়া অর্থ। সৌদি রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ওহাবি মতবাদ বিস্তারের ধারাবাহিকতায়ই জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে বলা যায়।

আমরা এও জানি, আমাদের দেশের অনেক জঙ্গি ও মৌলবাদী আফগানিস্থানে তালেবান এবং আল কায়দার কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এদের কেউ কেউ আফগানিস্থানে যুদ্ধও করেছে। ওই দেশে মোল্লা ওমর আর ওসামা বিন লাদেনের অনুসারী জঙ্গিরা যখন বামিয়ানের প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করেছিল, তখন ধিক্কার জানিয়েছিল সারা দুনিয়া। এমনকি কঠোর ইসলামী আইন মেনে চলে যে দেশ, সেই ইরানের পার্লামেন্টও নিন্দা জানিয়েছিল ওই ন্যক্কারজনক ঘটনার। তবে আফগানিস্থানের জঙ্গিরাও হাত দেয়নি অষ্টম শতকের সমরনায়ক আবু মুসলিম খোরাসানির ভাস্কর্যের গায়ে। গজনীতে এখনো স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে সেই ভাস্কর্য।

ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর স্রেফ রাজনৈতিক কারণে ভেঙে ফেলা হয়েছিল দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সুউচ্চ ভাস্কর্য। কিন্তু বাগদাদের সেই স্থানেই (আল-ফেরদৌস স্কয়ার) গড়ে তোলা হয়েছে মা-বাবা ও সন্তানের ২৩ ফুট উঁচু এক চমৎকার ভাস্কর্য। এটি তৈরি করেছেন তরুণ ইরাকি ভাস্কর বাসিম হামাদ আল-দাবিরি। মুসলমানদের কাছে মক্কা ও মদিনার পর সবচেয়ে পবিত্র নগরী বাগদাদ। এই নগরীতে আছে বাদশাহ শাহরিয়ার ও বেগম শাহেরজাদ, কাহরামানা, ডানাসহ আরো অনেক ভাস্কর্য।

কিছুদিন আগে একদল মৌলবাদীর হুমকির মুখে ঢাকায় জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে থেকে সরকার নির্মাণাধীন বাউল ভাস্কর্য ‘অচিন পাখি’ সরিয়ে নেওয়ার পর আমরা সমকালের পাতায় বেশ কিছু মুসলিম দেশে থাকা ভাস্কর্যের ওপর একটি সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরেছিলাম। প্রায় একই সময়ে আরেকটি জাতীয় দৈনিকে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও চিত্রপরিচালক হুমায়ুন আহমেদ এক লেখায়ও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। মহানবী হজরত মোহাম্মদের (সাঃ) প্রথম জীবনীকার ইবনে ইসহাকের (আরব ইতিহাসবিদ) লেখা ‘দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে হুমায়হৃন আহমেদ জানান, “আমাদের মহানবী (সাঃ) কাবা শরিফের ৩৬০টি মহৃর্তি অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেয়ালের সব ফেদ্ধসকো নষ্ট করার কথাও তিনি বললেন। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি পড়ল কাবার মাঝখানের একটি স্থানে, যেখানে বাইজেন্টাইন যুগের মাদার মেরির একটি অপহৃর্ব ছবি আঁকা। নবীজী (সাঃ) সেখানে হাত রাখলেন এবং বললেন, ‘এই ছবিটা তোমরা নষ্ট করো না।’ কাজটি তিনি করলেন সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর অসীম মমতা থেকে। মহানবীর (সাঃ) ইহকালের পরেও ৬৮৩ খ্রি¯ষ্টাব্দ পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ খলিফাদের যুগে কাবা শরিফের মতো পবিত্র স্থানে এই ছবি ছিল।” মুহাম্মদ আলী আল সাবুনির রওযাইউল বয়ান (২য় খ-) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে হুমায়ুন আহমেদ আরো লিখেছেন, ‘হজরত আয়েশা (রাঃ) নয় বছর বয়সে নবীজীর (সাঃ) সহধর্মিণী হন। তিনি পুতুল নিয়ে খেলতেন। নবীজীর তাতে কোনো আপত্তি ছিল না, বরং তিনিও মজা পেতেন এবং কৌতূহল প্রদর্শন করতেন।’ সৌদি আরবে এখনো খেলনা পুতুল বিক্রি হয় আইনসিদ্ধভাবে – এ তথ্যও আমরা উল্লেখ করেছি আগে।

পারস্যের যে কবির ‘নাত’ পাঠ ছাড়া আমাদের দেশে মিলাদই হয় না, সেই শেখ সাদীর কথা উল্লেখ করে হুমায়ুন আহমেদ লিখেছেন, ‘মাদ্রাসার উত্তেজিত বালকেরা শুনলে হয়তো মন খারাপ করবে যে, শেখ সাদীর মাজারের সামনেই তার একটি মর্মর পাথরের ভাস্কর্য আছে। সেখানকার মাদ্রাসার ছাত্ররা তা ভাঙেনি।’ এই ভাস্কর্যটি আছে এমন এক দেশে, যে দেশ কঠোর ইসলামী অনুশাসনে চলে। দেশটির নাম ইরান। ওই দেশের শিরাজে বিখ্যাত গোলেস্থান স্কয়ারে স্থাপিত শেখ সাদীর ভাস্কর্যটি বহু দুর থেকে মানুষকে টানে, যেমনটি টানে তার ‘নাত’।

মুসলিম দার্শনিক ও পন্ডিত ইবনে সিনার নাম কে না জানে। আমাদের দেশেই তার নামে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছে মৌলবাদীরা। তারা কি জানে তাজিকিস্থানের রাজধানী দুশানবেতে ইবনে সিনার একটি বিশাল ভাস্কর্য আছে। মুসলিমপ্রধান ওই দেশের কোনো নাগরিক তো ভাস্কর্যটির গায়ে আঁচড়ও দেন না। সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়া। সেই দেশেরই উত্তর সুলাবেসি দ্বীপের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর মানাদোতে রয়েছে যিশু খ্রিষ্টের এমন একটি ভাস্কর্য, যেটি এশিয়ায় সবচেয়ে উঁচু। ৩২ মিটার উঁচু একটি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ৩০ মিটার উঁচু ভাস্কর্যটি। এই ভাস্কর্য নিয়ে গা-জ্বালা নেই ইন্দোনেশীয় মুসলমানদের।

সৌদি আরব, ইরান এবং ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক মুসলিম দেশে এতসব ভাস্কর্য নিরাপদে টিকে থাকতে পারলেও বাংলাদেশে কেন ভাস্কর্য নিয়ে বিশেষ মহলের এত গা-জ্বালা? এটা কি এ কারণে যে, আমাদের দেশের বেশিরভাগ ভাস্কর্যই ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের স্মারক! এ কথা সবাই জানে, এ দেশের প্রধান মৌলবাদী গোষ্ঠীটি এসব আন্দোলন-সংগ্রামের ঘোর বিরোধী ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধকে ওরা মেনে নেয়নি আজও। এখনো বাংলাদেশকে পাকিস্থান বানানোর স্বপ্ন দেখে ওরা। সেটা যদি নাও পারে, অন্তত একটি ‘বাংলাস্থান’ বানাতে ওরা মরিয়া।



Advertisements

Leave a comment

Filed under Art and culture

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s