আবদুল আলীমের যত ‘কীর্তি’

আবদুল আলীম একাত্তরে ছিলেন জয়পুরহাট মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। ওই সময় তিনি ছিলেন কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা। মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রাজাকার রিক্রুট ছাড়াও রাজাকারদের প্রশিক্ষণ শেষে শপথ পড়াতেন আবদুল আলীম। শান্তি কমিটিকে সামরিক শাসনের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে ১৯৭১ সালে এটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের এক সরকারি রিপোর্টে।
১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ঘাতক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যোগসাজশে তাদের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে একাত্তরে প্রাদেশিক পরিষদের তথাকথিত উপনির্বাচনে বগুড়া-১ আসনে দালাল ছয় দলের সম্মিলিত প্রার্থী ছিলেন আবদুল আলীম।
একাত্তরে জয়পুরহাট মুক্ত হওয়ার পর সেখানে আবদুল আলীমকে খাঁচায় পুরে সাধারণ মানুষের দেখার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই স্বাধীনতার পর জয়পুরহাটে দালাল আইনে প্রথম মামলাটি হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
জয়পুরহাটের একজন ইউপি চেয়ারম্যান ১৯৯২ সালে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে (১৯৭১ সালের এপ্রিলে) আবদুল আলীমের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা কড়ইকাদিরপুর গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ঘেরাও করে ১৬৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে এবং বাড়িঘরে লুটপাট চালায়।
একাত্তরে জয়পুরহাটে বেশ কজন মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করেছিল হানাদার বাহিনী। চোখ বাঁধা অবস্থায় শহর ঘোরানোর পর তাঁদের হত্যা করা হয়। এর আগে হাত বাঁধা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ছবি তুলেছিল ঘাতকেরা। ছবিতে ওই অভিযানে নেতৃত্বদানকারী মেজর আফজালের পাশে আবদুল আলীমকে দেখা যায় হাস্যোজ্জ্বল দাঁড়ানো অবস্থায়।
জাতীয় গণতদন্ত কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জয়পুরহাটের শহীদ ডা. আবুল কাশেমের ছেলে ডা. নজরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, আবদুল আলীমের নির্দেশে ১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই রাতে ডা. আবুল কাশেমকে তাঁর বাসা থেকে ধরে নিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। স্থানীয় শান্তি কমিটির অফিস ও সেনাক্যাম্পে আটক রাখার পর ২৬ জুলাই ডা. আবুল কাশেমকে হত্যা করা হয়েছিল।
আক্কেলপুরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ৭ অক্টোবর পাহাড়পুর সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ধরা পড়লে আলীমের নির্দেশে পরের দিন জয়পুরহাট শহরে ট্রাকের পেছনে বেঁধে নির্যাতনের পর খুন করা হয়। এ ছাড়া জয়পুরহাট সীমান্তবর্তী পাগলা দেওয়ানে শত শত শরণার্থী হত্যাসহ নির্যাতন করার অভিযোগ আছে আলীমের বিরুদ্ধে।
জয়পুরহাটের মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলী গণতদন্ত কমিশনকে জানান, একাত্তরের ৫ ডিসেম্বর সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তিনি এলাকায় ঢুকেছিলেন। সেদিনই তাঁরা শান্তি কমিটির কার্যালয় দখল করে হত্যার জন্য চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের তালিকাসহ বেশ কিছু তালিকা উদ্ধার করেন। একটি দলিলে আবদুল আলীমের সই ছিল।
১৯৫৮ সালে মুসলিম লীগে যোগদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন আলীম।

আবদুল আলীমকে গত ২৭ মার্চ (২০১১) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই দিনই তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্যের বিচারক প্যানেল এ পরোয়ানা জারি করেন।  ট্রাইব্যুনাল আবদুল আলীমকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) আদেশ দেন। গ্রেপ্তারের আদেশ ২৭ মার্চ দুপুরেই জয়পুরহাটে পেঁৗছে। রাত ৯টা ৫ মিনিটে আবদুল আলীমকে গ্রেপ্তার করে জয়পুরহাট জেলা পুলিশ।

Advertisements

Leave a comment

Filed under History, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s