সাঈদীর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরে ৩ হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, নয় জনেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাংচুর এবং একশ থেকে দেড়শ হিন্দুকে ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগ এসেছে।  ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(সি), ৩(২)(জি) এবং ৩(২)(এইচ) ধারা অনুযায়ী এগুেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, জামায়াতের এই নেতা এক দল লোক নিয়ে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করেন। তাদের সহায়তায় পিরোজপুরের বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ চলে। সাঈদীর বিরুদ্ধে করা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- ৩ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে যে কোনো দিন পিরোজপুরের বাগমারা গ্রামের ভাগীরথীকে গুলি করে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া, ৮ মে মানিক পশারী ও তার ভাইয়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে হত্যা, ২৫ মে থেকে ৩১ জুনের মধ্যে নলবুনিয়া গ্রামে আজহার আলীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার ছেলে সাহেব আলীকে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া, ২ জুন বিশা আলীকে নারিকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা।
সাঈদীর বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ- একাত্তরের ৪ মে মধ্যম মাছিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে জমায়েত হওয়া ২০ জন নিরীহ বাঙালিকে গুলি করে হত্যা, একইদিন মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ চালিয়ে বিজয় কৃষ্ণ মিস্ত্রী, উপেন্দ্রনাথ মিস্ত্রী, সুরেন্দ্রনাথ মিস্ত্রী, মতিলাল মিস্ত্রী, যজ্ঞেশ্বর মন্ডল, সুরেন মন্ডলসহ ১৩ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা, একইদিন ধোপাবাড়িরে সামনে দেবেন্দ্রনাথ মন্ডল, খগেন্দ্রনাথ, পুলিন বিহারী, মুকুন্দ বালাকে হত্যা, ৫ মে পিরোজপুরের এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ, এসডিও মো. আব্দুর রাজ্জাক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাঈফ মিজানুর রহমানসহ কয়েকজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা।
জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ- ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে আন্ধাকুল গ্রামের বিমল হাওলাদারের ভাই ও বাবাকে ধরে কুড়িয়ানা হাইস্কুল ক্যাম্পে নিয়ে তাদেরসহ ২৫০০/৩০০০ নিরীহ বাঙালিকে কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগানে নিয়ে হত্যা, ২৫ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়ের যে কোনো এক দিন হোগলাবুনিয়া গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে তরণী সিকদার ও তার ছেলে নির্মল সিকদার, শ্যামকান্ত সিকদার, বানীকান্ত সিকদার, হরলাল কর্মকার, মাইঠভাঙ্গারের প্রকাশ সিকদারসহ ১০ জনকে গুলি চালিয়ে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া, ৪ মে হতে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে পাড়েরহাটে আক্রমণ করে হরলাল মালাকার, অরকুমার মির্জা, তরণীকান্ত সিকদার, নন্দকুমার সিকদারসহ ১৪ হিন্দুকে রশিতে বেঁধে পাকিস্তানি সেনাছাউনীতে নিয়ে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া।
সাঈদীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের যে অভিযোগগুআে উঠেছে- ১ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে হোগলাবুনিয়া গ্রামের মধুসুধন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে আটক করে ধর্ষণ, ২৫ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে উমেদপুর পাড়েরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার তিন বোন মহামায়া, অন্যরাণী ও কমলা রাণীকে সেনাক্যাম্পে নিয়ে ধর্ষণ, ৩ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে নিজ বাড়িতে আটকে নিয়মিতভাবে ধর্ষণ।
এছাড়া ২৫ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে পাড়েরহাট বন্দরের কৃষ্ট সাহাকে হত্যার পর তার মেয়েসহ হিন্দুপাড়ার অসংখ্য নারীকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে ধর্ষণের পর, ২৫ জুন হতে ৩১ জুনের মধ্যে মধুসুদন ঘরামী, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ন সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, হরিলাল, অমূল্য হাওলাদার, শান্তি রায়, জুরান, ফকির দাস, জোনা দাসসহ ১০০/১৫০ জন হিন্দুকে ধর্মান্তরে সাঈদী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আমলে নেয়। গত ৩১ মে সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের ৪ হাজার ৭৪ পৃষ্ঠার ১৫ খণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় জমা দেয় তদন্ত সংস্থা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দেড় বছর পর সোমবার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে জামায়াত নেতা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে তার বিচার শুরুর দিন ঠিক হয়েছে। সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পালা শুরু হলো।

একাত্তরে তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না। ছিলেন সাধারণ একজন মুদি দোকানদার। কেউ কেউ তাকে ডাকত ‘দেলু’ নামে, কেউ ডাকত ‘দিউল্লা’। মুক্তিযুদ্ধই তার ভাগ্য খুলে দেয়। স্থানীয় জামায়াত ও মুসলিম লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে এলাকার অপর চার সহযোগীকে নিয়ে ‘পাঁচ তহবিল’ নামে একটি সংগঠন পড়ে তুলেন নিজেই। জাতীয় গনতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ওই সংগঠনের প্রধান কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী বাঙালি হিন্দুদের বাড়িঘর দখল করা এবং তাদের সম্পদ লুট করা। লুট করা এ সম্পদকে সাঈদী ‘গণিমতের মাল’ আখ্যা দিয়ে নিজে ভোগ করতেন এবং পাড়েরহাট বন্দরে এসব বিক্রি করে ব্যবসা চালাতেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে এলাকায় হানাদার বাহিনীর সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী গঠন করে প্রত্য ও পরোভাবে লুটতরাজ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার অভিযোগ তুলে ধরা হয় গণতদন্ত কমিশন রিপোর্টে। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী মুহম্মদ জাফর ইকবালের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদ হত্যার সঙ্গেও সাঈদীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। ফয়জুর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করতেন- এটাই ছিল তার অপরাধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর আত্মগোপনে থেকে এক পর্যায়ে ওয়াজ মাহফিলের নামে শুরু করেন ধর্ম নিয়ে ব্যবসা। তারপর অল্পদিনের মধ্যেই উঠে আসেন জামায়াতে ইসলামীর সামনের সারির নেতৃত্বে।
১৯৮৭ সালের আগস্টে মাসিক নিপুণ পত্রিকায় সাঈদীকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে পাড়েরহাট ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা মিজান একাত্তরে সাঈদীর তৎপরতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর প্রত্য সহযোগিতায় লিপ্ত ছিলেন। তিনি ধর্মের দোহাই দিয়ে পাড়েরহাট বন্দরের হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি লুট করেছেন ও নিজে মাথায় বহন করেছেন এবং মদন নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীর বাজারের দোকানঘর ভেঙ্গে তার নিজ বাড়ি নিয়ে গিয়েছেন। দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী সাহেব বাজারের বিভিন্ন মনোহরী ও মুদি দোকান লুট করে লঞ্চঘাটে দোকান দিয়েছিলেন। দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর অপকর্ম ও দেশদ্রোহিতার কথা এলাকার হাজার হাজার মানুষ আজো ভুলতে পারেনি।’
অ্যাডভোকেট আলী হায়দার খান ১৯৯২ সালে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনকে জানান, একাত্তরে সাঈদীর সহযোগিতায় তাঁদের এলাকার হিমাংশু বাবুর ভাই ও আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করা হয়েছে। পিরোজপুরের মেধাবী ছাত্র গণকান্তি হালদারকেও সাঈদী ধরে নিয়ে হত্যা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য সরবরাহকারী ভাগীরীকে তার নির্দেশেই মোটর সাইকেলের পেছনে বেঁধে পাঁচ মাইল পথ টেনে নিয়ে হত্যা করা হয়। তখনকার এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ (হুমায়ুন আহমেদের বাবা), ভারপ্রাপ্ত এসডিও আবদুর রাজ্জাক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান, হেডমাষ্টার আবদুল গফফার মিয়া, সমাজসেবী শামসুল হক ফরাজী, অতুল কর্মকারকে সাঈদীর প্রত্য সহযোগিতায় হত্যা করা হয়। পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাপ্টেন আজিজের সঙ্গে সাঈদীর সুসম্পর্কের কারণে তিনি তাকে নারী ‘সাপ্লাই’ দিতেন বলেও জানান আলী হায়দার খান।
অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক খান গণতদন্ত কমিশনকে জানান, একাত্তরে সাঈদী পিরোজপুরের পাড়েরহাট বন্দরে বিপদ সাহার বাড়ি দখল করে সেখানে বসবাস এবং অসামাজিক কার্যকলাপ চালাতেন। এছাড়া এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের তালিকা তৈরি করে আর্মির কাছে সরবরাহ এবং নারীদের ধরে নিয়ে সেনাক্যাম্পে তুলে দিতেন।
অ্যাডভোকেট রাজ্জাক খান আরো জানান, সাঈদী পিরোজপুরে পাকিস্তানী সেনাদের ভোগের জন্য বলপূর্বক মেয়েদের ধরে নিয়ে তাদের ক্যাম্পে পাঠাতেন। হানাদার বাহিনীর সহযোগিতায় সাঈদী পাড়ের হাট বন্দরটি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে জোর করে তরুনদের ধরে নিয়ে আল বদর বাহিনীতে ভর্তি হতে বাধ্য করতেন। কেউ বিরোধিতা আপত্তি করলে তাকে হত্যা করা হতো।
সুফিয়া হায়দার ও আলী হায়দার জানান, সাঈদীর সহযোগিতায় ফয়জুর রহমান আহমেদকে পাকিস্তানী সৈন্যরা হত্যা করে এবং হত্যার পরদিন সাঈদীর বাহিনী পিরোজপুরে ফয়জুর রহমানের বাড়ি সম্পূর্ণ লুট করে নিয়ে যায়।
একাত্তরের জুন মাসে হত্যা ও লুটের অভিযোগে ২০০৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জিয়ানগর থানায় সাঈদী ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই এলাকার মাহবুবুল আলম হাওলাদার। এছাড়া একাত্তরের মে মাসে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলমারী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর বাড়িতে জোর করে ঢুকে লুট, অগ্নিসংযোগ এবং বাড়ির কেয়ারটেকারকে হত্যার অভিযোগে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন মানিক পশারীর। বিচারক মামলাটি এজাহারভুক্ত করতে নির্দেশ দেন সদর থানার ওসিকে।

Advertisements

Leave a comment

Filed under History, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s