নিজামী : আল-বদর শিরোমণি

একাত্তরে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘই ছিল কুখ্যাত রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর নেতৃত্বে। পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটিকে তখন রূপান্তর করা হয়েছিল আল-বদর হাইকমান্ডে। ছাত্রসংঘের সারা পাকিস্তানের প্রধান হিসেবে মতিউর রহমান নিজামীই ছিলেন আল-বদরের সর্বেসর্বা। তার নির্দেশেই গড়ে ওঠে এ ঘাতক বাহিনী। শুধু সাধারণ মানুষকেই নয়, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করেছে ওরা। লাহোর থেকে প্রকাশিত সাইয়িদ মুতাক্কিউল রহমান ও সালিম মনসুর খালিদের লেখা ‘জাব ভুহ নাজিম-ই আলা দি’ (যখন তারা নাজিম-ই আলা ছিলেন) বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানী বংশোদ্ভূত গবেষক সাইয়েদ ওয়ালি রেজা নাসের তার The Vanguard of The Islamic Revolution : The Jamaat-i Islami of Pakistan বইয়ে লিখেছেন, একাত্তরে সরকারের অনুপ্রেরণায় ইসলামী ছাত্রসংঘ (ইসলামী জমিয়তে তুলাবা বা IJT) হয়ে ওঠে জামায়াতে ইসলামীর মূল শক্তি। আর্মির সহায়তায় এরা আলবদর ও আলশামস নামে দুটি প্যারামিলিটারি ইউনিট গঠন করে বাঙালি গেরিলাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য। ইসলামী ছাত্রসংঘের তখনকার প্রধান মতিউর রহমান নিজামী আলবদর ও আলশামস বাহিনী সংগঠিত করেন।
পাকিস্তানে নির্বাসিত আফগান সাংবাদিক ও গবেষক মুসা খান জালাজাই তার Secterianism and the politico-religious Terrorism in Pakistan গ্রন্থে লিখেছেন, সেনাশাসনের সঙ্গে ছাত্রসংঘকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেেত্র নিজামীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।… আল-বদর ও আল-শামস গড়ার সিদ্ধান্তটাও নিজামীর।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে পাঠানো গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, একাত্তরের ১৪ জুন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমায় ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মতিউর রহমান নিজামী বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করছে তাতে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা সম্ভব। নিজামী বলেন, ইসলাম রায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে। এ জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন তিনি।
নিজেদের দলীয় মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এ সে বছর ১৪ নভেম্বর ‘জনতার পার্লামেন্ট’ কলামে ‘বদর দিবস : পাকিস্তান ও আলবদর’ শীর্ষক এক নিবন্ধে নিজামী লিখেছিলেন, ‘আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে। পাক বাহিনীর সহযোগিতায় এদেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ ছাত্রসমাজ বদর যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে রেখে আল-বদর বাহিনী গঠন করেছে।’ নিবন্ধে আরো বলা হয়, ‘সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আল-বদরের তরুণ যুবকেরা হিন্দুস্তানের অস্তিত্ব খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।’ ১৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রাম-এ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার বিষয়ে নিজামীর অঙ্গীকারের কথা প্রকাশিত হয়। সংগ্রামের খবরটি এ রকমÑ যশোরে রাজাকার সদর দফতরে সমবেত রাজাকারদের উদ্দেশ্য করে নিজামী বলেন, ‘জাতির এই সংকটজনক মুহূর্তে প্রত্যেক রাজাকারের উচিত ঈমানদারীর সাথে তাদের উপর অর্পিত এ জাতীয় কর্তব্য পালন করা এবং ঐ সকল ব্যক্তিকে খতম করতে হবে যারা সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।’
একাত্তরের ২৩ সেপ্টেম্বর নিজামী ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় আলবদর ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। সেখানে এক চা-চক্রে তিনি বলেন, মাদ্রাসা ছাত্ররা দেশ রায় একযোগে এগিয়ে এসেছে। কারণ তারা ইসলামকে ভালবাসে। পাকিস্তানকে ভালবাসে। (দৈনিক সংগ্রাম, ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)
নিজামীর কাছে পাকিস্তান ছিল ‘আল্লাহর প্রিয় ভূমি’। একাত্তরে চট্টগ্রামে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তার প্রিয়ভূমি পাকিস্তানকে রা করার জন্যে ঈমানদার মুসলমানদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমানেরা যখন রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা রাজনৈতিক পন্থায় করতে ব্যর্থ হল, তখন আল্লাহ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তার প্রিয়ভূমির হেফাজত করেছেন।’ (দৈনিক সংগ্রাম, ৫ আগস্ট ১৯৭১)
একাত্তরে পাকিস্তানের আজাদী দিবস (১৪ আগস্ট) উপলে ইসলামী ছাত্রসংঘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সভা করে। এতে সভাপতিত্ব করেন নিজামী। সভায় তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান কোন ভূ-খণ্ডের নাম নয়, একটি আদর্শের নাম। এই ইসলামী আদর্শের প্রেরণাই পাকিস্তান সৃষ্টি করেছে এবং এই আদর্শই পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখতে সম।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইসলামপ্রিয় ছাত্র সমাজ বেঁচে থাকতে পাকিস্তানের অস্তিত্ব টিকে থাকবে। ’ (দৈনিক সংগ্রাম, ১৬ আগস্ট ১৯৭১)
মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সমর্থকদের ভারতের এজেন্ট ও দুষ্কৃতকারী বলত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। একইভাবে ওই সময় বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকেও ভারতীয় এজেন্ট বলে অভিহিত করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী। আর জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম শহীদ মতিউরকে বলেছিল ‘বিশ্বাসঘাতক’।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য বাঙালি ফাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটি থেকে একটি জেটবিমান ছিনতাই করে পালিয়ে আসার সময় কো-পাইলট রশীদ মিনহাজ তাকে বাধা দেয়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলে একপর্যায়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। শহীদ হন মতিউর রহমান। মিনহাজও নিহত হয়। কিন্তু হানাদার বাহিনীর অন্যতম দোসর নিজামী তখন মিনহাজের পিতার কাছে পাঠানো এক শোকবার্তায় বাঙালির শ্রেষ্ঠ বীর মতিউরকে ভারতীয় এজেন্ট বলে উল্লেখ করেন। আর নিহত মিনহাজকে সম্বোধন করেন ‘শহীদ’ বলে। ১৯৭১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দৈনিক সংগ্রামের পাতা থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
‘মিনহাজের পিতার নিকট ছাত্রসংঘ প্রধানের তারবার্তা’ শিরোনামে দৈনিক সংগ্রামের ওই খবরে বলা হয়, ‘পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি জনাব মতিউর রহমান নিজামী শহীদ রশীদ মিনহাজের পিতার নিকট এক তারবার্তা প্রেরণ করেছেন বলে সংগঠনের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ। তারবার্তায় জনাব নিজামী বলেন যে, পাকিস্তানি ছাত্রসমাজ তার পুত্রের মহান আত্মত্যাগে গর্বিত। ভারতীয় হানাদার ও এজেন্টদের মোকাবেলায় মহান শহীদ মিনহাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অক্ষুন্ন রাখতে তারা বদ্ধপরিকর।’
এর আগে সে বছরের ১ সেপ্টেম্বর জামায়াতের পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামে ‘শহীদ মিনহাজের জীবনের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘মাত্র ২০ বছর বয়সে যে বীর অমরত্ব লাভ করেছেন, তিনি শাহাদাত বরণ করার সময় তার দেশ ও পাকিস্তান বিমানবাহিনী ছাড়া আর কিছুই স্মরণ করেননি। ‘আমাকে হাইজ্যাক করা হচ্ছে’– এই ছিল তার শেষ কথা যা টেপরেকর্ডারে ধরা পড়েছে। এই কণ্ঠস্বর ছিল পরিষ্কার ও জোরালো এবং কথাটি তিনবার উচ্চারণ করা হয়েছে। প্রথমবার ছিল অনুমান করার মতো ঠিক যখন বিশ্বাসঘাতক ফাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তাকে কোরোফর্ম দিয়ে কাবু করার চেষ্টা করছিল।’’ ‘বেস কমান্ডারের তথ্য প্রকাশ’ উপশিরোনামে ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘যে বিশ্বাসঘাতক বিগত ২০ শে আগস্ট একটি ট্রেনিংদাতা জেট বিমানকে ভারতে হাইজাক করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় তার নাম হচ্ছে মতিউর রহমান। সে করাচীর মসরুর বিমানঘাঁটিতে চাকুরীরত ছিল বলে বেস কমান্ডার আজ তথ্য প্রকাশ করেছেন।’
কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতদন্ত কমিশনকে পাবনা জেলার বেড়া থানার বৃশালিকা গ্রামের আমিনুল ইসলাম ডাবলু জানিয়েছিলেন, তার পিতা মো. সোহরাব আলীকে একাত্তরে নিজামীর নির্দেশেই হত্যা করা হয়। সাত নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস (গ্রাম-মাধবপুর, পাবনা) কমিশনকে জানান, আলবদর ক্যাম্পে দুসপ্তাহ আটক থাকা অবস্থায় তাদের হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। ওই সময় আলবদরদের একটি গোপন বৈঠকে উপস্থিত থেকে নিজামী মুক্তিযোদ্ধাদের সমূলে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন।

Advertisements

Leave a comment

Filed under History, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s