আল-বদর বাহিনীর আরেক হোতা মুজাহিদ

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৭১ সালে ছিলেন দলের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি। সেই সুবাদে তিনি ছিলেন ঢাকার আল-বদর বাহিনীর কমান্ডার। এ বাহিনীর প্রধান ছিলেন পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের তৎকালীন সভাপতি বর্তমানে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে পাঠানো গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ১৭ অক্টোবর রংপুরে ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ আল-বদর বাহিনী গড়ে তুলতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ইসলামবিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। এ জন্য যুবকদের সংগঠিত করে আল-বদর বাহিনীতে যোগ দেওয়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম।
১৯৯১ ও ’৯৬ সালের নির্বাচনে ফরিদপুরের একটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মুজাহিদ শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছিলেন। পরে আর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সাহস দেখাননি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে একপর্যায়ে মন্ত্রিত্ব বাগিয়ে নেন তিনি। কিন্তু গত নির্বাচনে বিএনপি তার প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফকে বাদ দিয়ে মুজাহিদকে জোটের মনোনয়ন দেয় ফরিদপুর-৩ আসনে। নির্বাচনে তার ভরাডুবি হয়েছে।
চিহ্নিত এ স্বাধীনতাবিরোধী ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকায় বায়তুল মোকাররমে ‘বদর দিবস’ উপলে আয়োজিত এক সমাবেশে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল থেকে কোনো লাইব্রেরি হিন্দুদের ও হিন্দুস্তানী দালালদের লেখা বই-পুস্তক বেচাকেনা করতে পারবে না, আগামীকাল থেকে কোথাও হিন্দু বা হিন্দুস্তানী দালালদের বই-পুস্তক বেচাকিনা হতে দেখলে তা ভস্মিভূত করা হবে।’ (দৈনিক সংগ্রাম, ৮ নভেম্বর ১৯৭১)
ওই মিছিল ও সমাবেশ আয়োজন করেছিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ। তৎকালীন ঢাকা শহর ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি শামছুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে আলী আহসান মুজাহিদ ছাড়াও বক্তব্য রেখেছিলেন সংগঠনের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক মীর কাসেম আলী।
৮ নভেম্বর, ১৯৭১ তারিখে দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সমাবেশে মুজাহিদ বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান এছলামী ছাত্রসংঘ পৃথিবীতে হিন্দুস্তানের কোনো মানচিত্র স্বীকার করে না। এছলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর কাফেলা দিল্লিতে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত ছাত্রসংঘের একটি কর্মীও বিশ্রাম গ্রহণ করিবে না।… এখন হইতে দেশের কোনো পাঠাগার, গ্রন্থাগার, পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র বা দোকানে পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী কোনো পুস্তক রাখা চলিবে না। কোনো স্থান, গ্রন্থাগার ও দোকানে পাকিস্তানের আদর্শ ও সংহতিবিরোধী পুস্তক দেখা গেলে তাহা ভস্মীভূত করা হইবে।… বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু কিছু লোক এখনো পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী কাজ করিতেছে। জনগণ তাহাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন রহিয়াছেন। ইহুদীবাদের কবল হইতে বায়তুল মোকাদ্দসসহ দখলকৃত আরব এলাকা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য তিনি সমগ্র মোছলেম জাহানের প্রতি আহ্বান জানান।’
১৯৭১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর ছাত্রসংঘের এক অনুষ্ঠানে মুজাহিদ বলেছিলেন, ‘ঘৃণ্য শত্র“ ভারতকে দখল করার প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের আসাম দখল করতে হবে। এজন্য আপনারা সশস্ত্র প্রস্তু‘তি গ্রহণ করুন।’ ওই দিন দৈনিক সংগ্রাম-এ প্রকাশিত মুজাহিদের একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র- যুক্তি নয়’। সে বছর ২৫ অক্টোবর অপর এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের ছাত্র-জনতার প্রতি দষ্কৃতকারী (মুক্তিযোদ্ধা) খতম করার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। পরদিন দৈনিক সংগ্রাম-এ প্রকাশিত হয় এ খবর। ২৭ অক্টোবর রংপুর জেলা ছাত্রসংঘের কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে মুজাহিদ সবাইকে জেহাদি মনোভাব নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। (দৈনিক সংগ্রাম, ২৮ অক্টোবর ১৯৭১)
একাত্তরের ৪ ডিসেম্বর মুজাহিদ বলেছিলেন, ‘ছাত্র সমাজ ইস্পাতকঠিন শপথ নিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর পাশাপাশি লড়ে যাবে।’ (দৈনিক সংগ্রাম, ৫-১২-৭১)
কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, মুজাহিদ ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দলীয় আদর্শ অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা, লুটপাট ও নারী নির্যাতনে সহযোগিতা করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন আলবদর বাহিনী বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে এদেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের।
রিপোর্টে উল্লেখ আছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজাহিদ ফকিরাপুল ও নয়াপল্টন এলাকার বিভিন্নœ বাড়িতে থাকতেন, তার মধ্যে একটি বাড়ি হলো শেখ ভিলা, ৩/৫, নয়াপল্টন। তবে আলী আহসান মুজাহিদের প্রধান আড্ডা ছিল ফকিরাপুল গরম পানির গলিতে ফিরোজ মিয়ার ১৮১নং (বর্তমান ২৫৮নং) বাড়িটি। রিপোর্ট মতে, ১৯৭১-এ মতিঝিল ফকিরাপুল এলাকার মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার বর্তমানে জাতীয় পার্টি নেতা আবদুস সালাম, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক জিএম গাউস, মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট মাহবুব কামালের স্যা অনুযায়ী জানা গেছে, ফিরোজ মিয়া ছিলেন এ এলাকার রাজাকার কমান্ডার। তার বাড়িটি শুধু ফকিরাপুল এলাকার নয়, পুরো ঢাকা শহরের রাজাকারদের অন্যতম ঘাঁটি ছিল। এখানেই অনুষ্ঠিত হতো রাজাকারদের বিভিন্নœ সভা, সশস্ত্র ট্রেনিং ইত্যাদি। এখান থেকেই পরিচালিত হতো রাজাকারদের বিভিন্নœ অপারেশন, রাজাকার রিক্রুটমেন্ট। এখানে এলাকার মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তির লোকদের ধরে এনে নির্যাতন চালানো হতো। ফিরোজ মিয়া চক্রের নীতিনির্ধারক ছিলেন আলী আহসান মুজাহিদ।
গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, মুজাহিদের রিক্রুট ফিরোজ মিয়া ফকিরাপুল এলাকার ৩০০ সদস্যের একটি রাজাকার প্লাটুন গড়ে তোলে। ফকিরাপুল এলাকার পুরনো বাসিন্দাদের স্যা থেকে জানা যায়, ফিরোজ মিয়া গং যুদ্ধের সময় ফকিরাপুল ও আরামবাগ এলাকার শত শত বাঙালিকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। নির্যাতন চালিয়েছে এলাকার মেয়েদের ওপর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফকিরাপুল এলাকার এক কৃতী ফুটবলার কমিশনকে জানিয়েছেন, ‘ফিরোজ মিয়ার দল আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমেই একটি বাড়িতে নিয়ে রুলার দিয়ে বেদম প্রহার করে। পরে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় ফিরোজ মিয়ার রাজাকার বাহিনীর অফিসে। এখানেও আমাকে মাটিতে শুইয়ে কখনো সিলিংয়ে ঝুলিয়ে ফিরোজ মিয়া বহু মারধর করেছে। এ বাড়িতে বহু ভদ্র ও শিতি বাঙালি মেয়েকে ধরে এনে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তাদের ওপর প্রতিদিন-প্রতিরাতে চরম নির্যাতন চালানো হতো।’

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh liberation war, Crimes against huminity, History, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s