সেনা অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে একটি পুরনো লেখা

থাইল্যান্ডে ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর সে বছরের ২২ সেপ্টেম্বর দৈনিক সমকাল-এ প্রথম পাতায় আমার একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘থাইল্যান্ড : এরপর কোন দেশ?’ লেখাটি এখানে পোস্ট করা হলো

যে দেশে এর আগে ৪৫ বছরে ১৭টি সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, সেখানে আরেকটি অভ্যুত্থান ওই দেশের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় যেমন বড় ধরনের কোনো ওলট-পালট ঘটায়নি, তেমনি তা বিস্মিত করেনি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদেরও। যেমন বিস্মিত হননি লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের অধ্যাপক ও থাই বিশেষজ্ঞ টিম ফরসাইথ। তার মতে, থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে থাইরা যথেষ্ঠ উদ্বিগ্ন ছিল। স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে যে এ পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভব, সে বিশ্বাসও তারা হারিয়ে ফেলেছিল। টিম ফরসাইথের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি জানায়, থাকসিন সিনাওয়াত্রা ক্ষমতায় বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও ক্রমেই তার পরিবারের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে শুরু করেন। টিম ফরসাইথ বলেন, এ অবস্থায় সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস রয়েছে যে দেশে সেই থাইল্যান্ডে সেনাবাহিনীর এ হস্তক্ষেপ অভিনব কোনো ঘটনা নয়।
থাইল্যান্ডের এ সেনা অভ্যুত্থানের পর বিশ্লেষকরা এখন নজর রাখছেন এরপর আর কোন দেশে সেনা অভ্যুত্থান ঘটে তার দিকে। এরই মধ্যে সামরিক অভু্যত্থানের ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি দেশের নামও আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়া ও আফ্রিকায় সেনা অভ্যুত্থানের ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে আছে পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ফিজি, শাদ, ইকুয়েটরিয়াল গিনি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও আইভরি কোস্ট। এমনকি তুরস্ক ও মিসরের মতো দেশও এ ঝুঁকির বাইরে নেই।
জেইন’স কান্ট্রি রিস্কসের এশিয়া বিষয়ক সম্পাদক ক্রিশ্চিয়ান লোমিয়েরের মতে, এশিয়ার যে কোনো দেশের তুলনায় পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থানের ঝুঁকি অনেক বেশি। লোমিয়ের এএফপিকে বলেছেন, পাকিস্তানে ২০০৭ সালের নির্বাচনের আগে অথবা জেনারেল পারভেজ মোশাররফ পুনর্নির্বাচিত হলে নির্বাচনের পর সামরিক অভ্যুত্থান হতে পারে কিংবা সেনাবাহিনীর একাংশ বিদ্রোহ করে বসতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাটহাম হাউসের ডিরেক্টর ভিক্টর বালমার টমাসের মতে, এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ছাড়াও সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশ ও নেপালে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিরোধী দল যেসব কারণে সরকারের পতন চাইছে একই কারণ দেখিয়ে সামনে চলে আসতে পারে সেনাবাহিনীও।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে গত কয়েক বছরের মধ্যে অনেকবারই নান কথাবার্তা শোনা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি। পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও সামরিক শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ দেশের সামরিক বাহিনীর ভূমিকায় কিছু পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন কেউ কেউ। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক শান্তিরা মিশনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং এর ফলে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার কারণে সামরিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ অনেকটা কমে গেছে। লক্ষণীয় যে, নব্বইয়ের পর নানা টানাপড়েন সত্ত্বেও দেশে তিনটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক শক্তি পর্যায়ক্রমে দেশ পরিচালনা করেছে এবং করছে।
বিভিন্ন দেশে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কার কথা উঠলে আরেকটি প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। তথাকথিত স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হওয়ার পর থেকে কোনো কোনো মহল থেকে জোরেশোরেই বলা হতে থাকে, বিশ্বে সামরিক শাসনের যুগ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে এ তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এ সময় বেশ কয়েকটি দেশে সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। পাকিস্তানের সর্বশেষ ফৌজি শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্বও লুকানো বিষয় নয়। থাইল্যান্ডের সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমর্থন না জানালেও থাকসিনের পাশে যে তারা নেই এ কথা স্পষ্ট। অন্য কোনো দেশে আগামী দিনগুলোতে কী ঘটবে এবং সেক্ষেত্রে তথাকথিত বিশ্ব মোড়লদের ভূমিকা কেমন হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
পাকিস্তানে জেনারেল মোশাররফের বিরুদ্ধে এ মুহূর্তে বড় ধরনের অসন্তোষ নেই। উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তারা এখনো তার পক্ষেই আছেন। তবে লোমিয়ের মনে করেন, সামরিক বাহিনীর ভেতরে যে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট কাজ করছে না, তা বলা কঠিন। ‘ইসলামপন্থি’ দলগুলোর ইন্ধনে ভবিষ্যতে এ মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠাও অস্বাভাবিক নয়। এছাড়া বেলুচিস্তান পরিস্থিতিও সরকারের গলার কাঁটা হয়ে আছে।
অন্যদিকে নেপালে মাওবাদীদের সাম্প্রতিক উত্থানকে শেষ পর্যন্ত সেদেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে নেবে তা নিয়েও সংশয়ে আছেন পর্যবেক্ষকরা। গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত রাজা জ্ঞানেন্দ্রর পক্ষে না থাকলেও মাওবাদী গেরিলাদের সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণ তারা চূড়ান্তভাবে মেনে নেবে কিনা সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। কেননা সেনাবাহিনীতে রানা বংশের যে প্রাধান্য রয়েছে মাওবাদীদের অংশগ্রহণের পর তা থাকবে না।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s