চৌধুরী মঈনুদ্দীন : বুদ্ধিজীবী হত্যার অপারেশন-ইন-চার্জ

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর ধরা পড়ে আল-বদর কমান্ডার খালেক মজুমদার বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছিল। তখন সে জানিয়েছিল যে, আল-বদররাই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে; আর চৌধুরী মঈনুদ্দীন বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অপারেশন-ইন-চার্জ। এ বিষয়ে সে বছর ২৩ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক-এ এবং ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ অবজারভার-এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ইত্তেফাক-এর প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘নরপিশাচ আল-বদরের আরেকজন গ্রেফতার : অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটিত’। ‘অ্যাবস্কনডিং আল-বদর গ্যাংস্টার’ শিরোনামে বাংলাদেশ অবজারভার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর সদস্য চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অপারেশন-ইন-চার্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে ধরা পড়া আল-বদর রিং লিডার ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মকর্তা আবদুল খালেক। ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে চৌধুরী মঈনুদ্দীনের ছবিও ছাপা হয়েছিল। ৩ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে ‘অ্যা জার্নালিস্ট ইজ লিঙ্কড টু মার্ডার অব বেঙ্গলিজ’ শিরোনামে নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, যে বাংলা পত্রিকাটিতে মঈনুদ্দীন কাজ করতেন সেখানকার সহকর্মী রিপোর্টারদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন বন্ধুবৎসল, ভদ্র ও বুদ্ধিমান যুবক হিসেবে। তার চেহারা ছিল আকর্ষণীয়। দাড়ি ছিল সুন্দর করে ছাঁটা। একটি ডানপন্থি মুসলিম রাজনৈতিক দলের নেতার কাছ থেকে আসা টেলিফোন কল রিসিভ করা ছাড়া তার েেত্র অন্য কিছু ব্যতিক্রম ল্য করা যেত না। কিন্তু গত কয়েকদিনের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ওই কলগুলো ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মঈনুদ্দীনকে শনাক্ত করা হয়েছে উগ্র মুসলিমদের একটি গোপন কমান্ডো ধরনের সংগঠনের প্রধান হিসেবে, যে সংগঠনটি কয়েকশ বাঙালি অধ্যাপক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও সাংবাদিককে ঢাকার একটি ইটখোলায় নিয়ে হত্যা করেছে। যুদ্ধের শেষ তিন রাতে আল-বদর নামে পরিচিত ওই সংগঠনের কালো সুয়েটার ও খাকি প্যান্ট পরা সদস্যরা বুদ্ধিজীবীদের ধরে বধ্যভূমিতে নিয়ে যায়। আটক আল-বদর সদস্যরা জানিয়েছে, তাদের ল্য ছিল স্বাধীনতার পরে সব বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে মেরে ফেলা।
শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে শাহীন রেজা নূর ২০০৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক-এ লিখেছেন, ‘চৌধুরী মঈনুদ্দিন নামক এক সাংবাদিক যে তদানিন্তন দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় কর্মরত ছিল সে-ই এই বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ স্কোয়াডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে।’
ব্রিটেনে বসবাসরত তিনজন বাংলাদেশির একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে ১৯৯৫ সালে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে ব্রিটিশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টুয়েন্টি টুয়েন্টি টেলিভিশন। কয়েক পর্বের এ প্রামাণ্যচিত্রটি প্রচার করে চ্যানেল ৪। অভিযুক্ত এই তিন যুদ্ধাপরাধী হলো চৌধুরী মঈনুদ্দীন, আবু সাঈদ ও লুৎফর রহমান। ‘ওয়ার ক্রাইমস ফাইল’ নামের ওই প্রামাণ্যচিত্রে চৌধুরী মঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ (প্রত্যদর্শীদের বিবরণসহ) তুলে ধরা হয় সেগুলো হলো–
১. অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে অপহরণ ও গুম করা
A family member present at the scene states: “they stormed into the house brandishing guns and with gamchas over their faces. While being taken away, [Prof Chaudhury] pulled down the gamcha from one of the men’s faces, I recognised him immediately. It was Mueen-Uddin; I knew him because he used to come to our house to study.”
২. সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণ ও গুম করা
Serajuddin Hossain’s wife identified Chowdhury Mueen-Uddin as one of the men who took her husband.
৩. সাংবাদিক আতাউস সামাদকে অপহরণের চেষ্টা।
Two tenants were woken up by a gang of men and saw the faces of the leader. After independence, when a photograph of Mueen-Uddin’s face was published they both recognised him as the man leading the abductions, that night.
প্রামাণ্যচিত্রের শেষপর্বে একজন ব্রিটিশ আইনপ্রণেতার সাাৎকার রয়েছে। ওই আইনপ্রণেতা বলেন, ব্রিটেনের জেনেভা কনভেনশন অ্যাক্ট ১৯৫৭ অনুযায়ী যে কোনো দেশের যুদ্ধাপরাধীর বিচার করার এখতিয়ার ব্রিটিশ সরকারের আছে। পরবর্তী কালে চ্যানেল-৪সহ সংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের প থেকে ব্রিটিশ পুলিশ বিভাগের (স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড) ওয়ার ক্রাইমস ইউনিটের কাছে দাবি জানানো হয় ওই তিন অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীর বিষয়ে তদন্ত ও বিচারকাজ শুরু করার জন্য। ব্রিটিশ সরকার বিচারকাজ শুরু করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়ে দেয় ১৯৯৬ সালের প্রথমার্ধেই। ওই তিন জনের বিষয়ে তদন্ত ও বিচারকাজ সম্পর্কে জানতে চেয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প থেকে দেওয়া এক চিঠির জবাবে ব্রিটিশ মেট্রোপলিটন পুলিশ সার্ভিসের ওয়ার ক্রাইমস ইউনিটের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মি. ম্যাকডারমেট ২২-১০-৯৬ তারিখে এক পত্রের মাধ্যমে জানান, ১৯৯৫ সালের মে মাসে চানেল-৪ এর ডেভিড লয়েসের কাছ থেকে তারা চৌধুরী মঈনুদ্দীনসহ অভিযুক্ত তিনজন যুদ্ধাপরাধী প্রসঙ্গে বেশ কিছু সংরতি তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এরপর ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসেস এবং পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ অফিসের পরামর্শক্রমে ওইসব তথ্য তারা পাঠিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে। চিঠিতে ম্যাকভারমেট এ কথাও উল্লেখ করেন যে, একাত্তরে ওই তিন ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে থাকলে তার বিচার করার প্রাথমিক এখতিয়ার বাংলাদেশ সরকারের। বাংলাদেশ সরকার যদি এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে তাহলে তারা প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা দেবেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যা, হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ, বেআইনিভাবে ঘরে প্রবেশ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র প্রভৃতি অভিযোগে চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী গিয়াসউদ্দীনের বোন ফরিদা বানু মামলাটি করেন। গিয়াসউদ্দীন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক। মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, আল-বদরের একটি দল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মুহসীন হল প্রাঙ্গণ থেকে চোখ বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যায় গিয়াসউদ্দীনকে। আর ফিরে আসেননি তিনি। অপহরণকারী দলে ছিল আশরাফুজ্জামান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীন। মামলার বাদী ফরিদা বানু জানান, তিনি ও তাঁর অন্য স্বজনরা ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি গিয়াসউদ্দীনের গলিত লাশ শনাক্ত করেছিলেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন যে, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সিরাজুল হক, রাশীদুল হাসান, ড. আবুল খায়ের ও ডা. গোলাম মর্তুজাসহ আরো কয়েকজনকে একই কায়দায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মর্তুজার স্ত্রী এবং সিরাজুল হকের ছেলে দুই অপহরণকারীকে চিনতে পারেন। ওই দুজন হলো আশরাফুজ্জামান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীন। কয়েক বছর তদন্তশেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করে। মামলাটি আইনের সঠিক ধারায় হয়নি বলে যুক্তি দেখায় সিআইডি।

Advertisements

1 Comment

Filed under Bangladesh liberation war, Crimes against huminity, History, War crimes

One response to “চৌধুরী মঈনুদ্দীন : বুদ্ধিজীবী হত্যার অপারেশন-ইন-চার্জ

  1. partha

    শেয়ার করলাম।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s