বাচ্চু রাজাকার গোয়েন্দাদের ফাঁকি দিল কীভাবে!

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পালিয়েছে আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার। বাচ্চু রাজাকারকে খুঁজে পায়নি গোয়েন্দা পুলিশ। রাতের অ‍াঁধারে সে পালিয়ে গেছে গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে। মঙ্গলবার (৩ এপ্রিল ২০১২)রাজধানীর উত্তরখানের ২৮৯/৬, চানপাড়ার আজাদ ভিলায় তার ফ্ল্যাটসহ চারতলা ওই ভবনের সব ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেষরাতের দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে বাচ্চু রাজাকার, আর ফেরেনি।
এদিকে গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারি থাকলেও কিভাবে সে  পালিয়ে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অবশ্য গোয়েন্দা পুলিশ তাদের নজরদারির দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছে। এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে, বাচ্চু রাজাকার ওই রাতে বাসায়ই ছিল না। বেশ কিছুদিন আগেই সে গা ঢাকা দিয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভুমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
আজাদ ভিলায় তল্লাশি শেষে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির সহকারী কমিশনার সুনন্দা রায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাচ্চু রাজাকারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাসা থেকে জানানো হয়েছে, তিনি শেষরাত সাড়ে তিনটার দিকে বাসা থেকে  বেরিয়ে গেছেন।’ এত নজরদারির মধ্যে থেকেও তিনি কিভাবে পালিয়ে গেলেন, জানতে চাইলে সুনন্দা বলেন, ‘যেহেতু তার নামে আগে ওয়ারেন্ট ছিল না, সেহেতু কঠোরভাবে নজরদারি করা হয়নি। একটু দুর্বলতা ছিল এটা স্বীকার করতে হবে। সেজন্য হয়তো পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।’
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে নিজ এলাকায় মাওলানা আবুল কালাম আজাদের পরিচয় ছিল বাচ্চু রাজাকার হিসেবে। তার স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার প্রত্যক্ষদর্শী জেলার বোয়ালমারীর কালিনগরের মুক্তিযোদ্ধা মো. ইদ্রিস ফকির সাংবাদিকদের জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাচ্চু রাজাকার অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে পাকবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে এবং আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে বন্দিদের মধ্য থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মেয়েদের ধরে নিয়ে সে পাক সেনাদের ক্যাম্পে সাপ্লাই দিতো। ১৯৭১ সালের আনুমানিক ২ মে পাকবাহিনী ফরিদপুরের হাসামদিয়া ও ময়েনদিয়া গ্রামে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। ওই সময় তাদের প্রধান দোসর হিসেবে বাচ্চু রাজাকার তাদের সঙ্গে ছিল এবং সে নিজে চার নিরীহ গ্রামবাসীকে হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করে।
জানা যায়, ১৯৭৫-এর পর বাচ্চু রাজাকার ফরিদপুর শহরের টেপাখোল মসজিদে ইমামতি করতো। সে সময় স্থানীয় একটি মেয়ের সর্বনাশ করায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তাকে তাড়িয়ে দেয়।
মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ মাসুদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ফরিদপুর স্টেডিয়ামের পাশে বন্দিশিবিরে আটকা পড়েছিলেন। সেখানে বাচ্চু রাজাকার আটক লোকজনকে নির্যাতন করতো। সৈয়দ মাসুদ বলেন, রাজাকার বাচ্চু কেবল গ্রামঅঞ্চলে নয় শহরেও অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় হানা দিয়েছে।
ফরিদপুর সালথা উপজেলার চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, রাজাকার আবুল কালাম আজাদ দেশ স্বাধীন হোয়ার পর ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগে দীর্ঘদিন হাজতবাস করেছে।
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার খাড়দিয়া গ্রামে রাজাকার বাচ্চুর বাড়ি। একাত্তরে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে হত্যা, লুট ও ধর্ষণসহ এমন নৃশংসতা চালায় যে আশপাশের ৫০ গ্রামে তার পরিচিতি দাঁড়ায় ‘খাড়দিয়ার মেলিটারি’ হিসেবে। তার বাড়িটি হয়ে ওঠে মিনি ক্যান্টনমেন্ট। নিজের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে সে তখন হত্যা করে হাসামদিয়ার হরিপদ সাহা, সুরেশ পোদ্দার, মল্লিক চক্রবর্তী, সুবল কয়াল, শরৎ সাহা; শ্রীনগরের প্রবীর সাহা, যতীন্দ্রনাথ সাহা, জিন্নাত আলী বেপারী; ময়েনদিয়ার শান্তিরাম বিশ্বাস, কলারনের সুধাংশু রায়, পুরুরার জ্ঞানেন, মাধব চন্দ্র বিশ্বাসসহ বিভিন্ন গ্রামের শতাধিক মানুষকে। ২০০১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক জনকণ্ঠ -এ এক প্রতিবেদনে একাত্তরে আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু মিয়ার কর্মকাণ্ডের কথা এভাবেই তুলে ধরা হয়।
একাত্তরে হত্যা, লুট ও অন্যান্য অভিযোগে আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ৩ মে ২০০৯ তারিখে ফরিদপুর ৩ নং আমলি আদালতে একটি মামলা করেন নগরকান্দা উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের জ্যোৎস্না রানী দাস (৬২)। বাদীর অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের সময় (১৯শে জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ) তার স্বামী চিত্তরঞ্জন দাসকে হত্যা করে আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু মিয়া ও তার শ্যালক মোহাম্মদ কাজী।
প্রায় একই রকম অভিযোগে ২০০৯ সালের ২০ এপ্রিল ফরিদপুরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন সালথা থানার পুরুরা গ্রামের ভক্ত রঞ্জন বিশ্বাস। তিনি শহীদ মাধব চন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে।
১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বোয়লমারী থানায় দালাল আইনেও মামলা হয়েছিল আজাদের বিরুদ্ধে।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Crimes against huminity, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s