কাদের মোল্লার যত অপরাধ

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিচার শুরু হয়েছে। আজ ২৮ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, ষড়যন্ত্র, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ছয়টি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে এই আদেশ দেয়। এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর জন্য ২০ জুন দিন রাখা হয়েছে।
মনবতাবিরোধী অপরাধের যে ছয় ঘটনায় কাদের মোল্লার জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে- সে সব ঘটনার বিবরণ আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।
পল্লবসহ সাত জনকে হত্যা
একাত্তরে মিরপুর-১১ নম্বরের বি-ব্লকের বাসিন্দা ও মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লব স্থানীয় বাঙ্গালি ও অবাঙ্গালিদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। ১৯৭১ সালের মার্চে ‘স্বাধীনতাবিরোধীরা’ পল্লবকে নবাবপুর থেকে ধরে মিরপুরে কাদের মোল্লার কাছে নিয়ে যায়।কাদের মোল্লার নির্দেশে পল্লবকে হাতে দড়ি বেঁধে টেনেহিঁচড়ে মিরপুর-১২ নম্বর থেকে ১ নম্বর সেকশনে শাহ আলী মাজার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে মিরপুর-১ নম্বর থেকে ১২ নম্বর সেকশনে ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয় একইভাবে।পরে পল্লবকে গাছে ঝুলিয়ে আঙুল কেটে দেওয়া হয়। দুদিন পর গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে।হত্যার দুদিন পর পল্লবের লাশ মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনে কালাপানি ঝিলের পাশে আরও ছয় জনের সঙ্গে মাটি চাপা দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।
কবি মেহেরুন্নেসা ও তার মা-ভাইকে হত্যা
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সকাল ১১টায় আব্দুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর একটি দল কবি মেহেরুন্নেসার মিরপুরের বাসায় যায়। কাদের মোল্লার নির্দেশে সেখানেই মেহেরুন্নেসাকে জবাই করে তারা।শরীর থেকে মাথা কেটে রশি দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় মেহেরুন্নেসার লাশ। জবাই করা হয় কবির দুই ভাই রফিকুল হক বাবলু, শরিফুল হক টুকু এবং তাদের মাকেও।
খন্দকার আবু তালেবকে হত্যা
একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরুর পর পালিয়ে আরামবাগে চলে যান মিরপুর ১০ নম্বরের বাসিন্দা খন্দকার আবু তালেব। ২৯ মার্চ তিনি মিরপুরে ফিরে দেখতে পান, সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।এরপর আরামবাগে ফেরার জন্য মিরপুর ১০ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে গেলে আব্দুল কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা রশি দিয়ে বেঁধে আবু তালেবকে জল্লাদখানা পাম্প হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে তাকে জবাই করা হয়।
কেরানীগঞ্জের দুই গ্রামে গণহত্যা
১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর সকালে কাদের মোল্লার নেতৃত্বে কেরানীগঞ্জের খানবাড়ি ও ঘটারচর এলাকার দুটি গ্রামে হামলা করে ৪২ জনকে হত্যা এবং বাড়ি-ঘরে আগুন দেওয়া হয়।
আলকদী গ্রামে গণহত্যা
একাত্তরের ২৪ এপ্রিল ফজরের নামাজের সময় পাকিস্তানি বাহিনী হেলিকপ্টারে করে তুরাগ নদের পাড়ে পল্লবীর আলকদী গ্রামের পশ্চিম পাশে অবতরণ করে। সে সময় কাদের মোল্লার নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর প্রায় ৫০ জন সদস্য ও কয়েকজন বিহারী ওই গ্রাম ঘিরে ফেলে। এরপর নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এই অভিযানে ৩৪৪ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রসিকিউশনের অভিযোগে।
হযরত আলী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা, ধর্ষণ
কাদের মোল্লা ও বিহারী আক্তার গুন্ডাসহ কয়েকজন বিহারী একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টার দিকে মিরপুরের শহীদ হযরত আলী লস্করের বাড়িতে হানা দেয়। তারা জোর করে ওই বাড়িতে ঢুকে হজরত আলীকে গুলি করে, তার অন্তসত্ত্বা স্ত্রী আমিনা ও দুই মেয়েকে (বয়স ৭ ও ৯ বছর) জবাই করে হত্যা করে। এরপর আলীর দুই বছরের ছেলে বাবুকে মাটিতে আছড়ে হত্যা করে কাদের মোল্লার সহযোগীরা। এসব দেখে চৌকির নিচে লুকিয়ে থাকা হযরত আলীর আরেক মেয়ে আমেনা চিৎকার করে উঠলে তাকে সেখান থেকে টেনে বের করে পলাক্রমে ধর্ষণ করা হয়।ওই সময় আলীর বড় মেয়ে মোমেনা সংজ্ঞা হারানোর কারণে প্রাণে বেঁচে যায়।
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গত ১ নভেম্বর জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের এসব অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। ২৮ ডিসেম্বর অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh liberation war, Crimes against huminity, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s