নিজামীর বিচার শুরু : বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মানবতাবিরোধী ১৬ অপরাধ

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মানবতাবিরোধী ১৬টি অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তার বিচার শুরু হলো। নিজামীর বিরুদ্ধে আগামী ১ জুলাই স্যাগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আজ ২৮ মে নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদেশ দেয়।
নিজামীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(সি), ৩(২)(জি), ৩(২)(এইচ), ৪(১), ৪(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উসকানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মোট ১৬টি ঘটনায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিজামীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন যেসব ঘটনা তুলে ধরেছে সেগুলোর মধ্যে একাত্তরের ডিসেম্বরে পাবনার বেড়া থানার বৃশালিকা গ্রাম ঘেরাও করে ৭০ জনকে গুলি করে হত্যা এবং ৭২টি বাড়িতে আগুন দেওয়া, ডেমরা ও বাউশগাড়ী গ্রামে ৪৫০ জন নারী-পুরুষকে গুলি করে হত্যা, সাঁথিয়া উপজেলার করমজা গ্রামে মন্দিরের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপ বুদ্ধিজীবী হত্যার সরাসরি অভিযোগ না আনলেও ট্রাইব্যুনাল সরাসরি অভিযোগ গঠন করেছেন। গত ৯ জানুয়ারি নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফরমাল চার্জ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। এতে মোট ১৫টি অভিযোগ ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঊষালগ্নে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজামীকে সরাসরি সম্পৃক্ত না করায় সেদিন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। জবাবে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী ও আলতাফ উদ্দিন আহমেদ ট্রাইব্যুনালে বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। সারা দেশে আলবদর বাহিনীর অপরাধের দায় নিজামীর। আর এ কারণে আলাদাভাবে অভিযোগ আনা হয়নি।
অভিযোগ গঠনকালে বুদ্ধিজীবী হত্যা যোগ হয়েছে।
নিজামীর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
এক : ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট নিজামী চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে শহর ছাত্রসংঘের এক সুধী সমাবেশে পাকিস্তান রার পে বক্তব্য দেন। ওই সভায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রসংঘের সভাপতি আবু তাহের হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার পে বলেন। নিজামী ওই সভায় উপস্থিত থেকেও আবু তাহেরের বক্তব্যের বিরোধিতা না করে মৌন সম্মতি দেন।
দুই : একই বছরের ২২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক একাডেমী হলে আল-মাদানী স্মরণসভায় বক্তব্য দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করেন স্বাধীনতাকামীদের নিশ্চিহ্ন করতে। এরপর তাঁরা সারা দেশে সংগঠিত হয়ে অপরাধ করতে থাকেন, যার দায় নিজামীর।
তিন : একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসমাবেশে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন নিজামী।
চার : একই বছরের ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর যশোর বিডি হলে ছাত্রসংঘের মিটিংয়ে জিহাদের সমর্থনে বক্তব্য দেন। নিজামী ওই মিটিংয়ে নিরীহ বাঙালি হত্যার নির্দেশ দেন।
পাঁচ : একই বছরের ১৪ মে নিজামীর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার, আলবদররা পাবনার ডেমরা ও বাউসগাতি গ্রাম ঘেরাও করে। এরপর ৪৫০ হিন্দুকে এক জায়গায় জড়ো করে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। সেখানে মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়।
ছয় : নিজামীর নির্দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় একই বছরের ৮ মে পাবনার সাঁথিয়া থানার করমজা গ্রামে লোক জড়ো করে নির্বিচারে সুরেন্দ্র নাথ ঠাকুরসহ অসংখ্য লোককে হত্যা করা হয়। ধর্ষণ করা হয় মহিলাদের।
সাত : একই বছরের ২৭ ও ২৮ নভেম্বর পাবনার সাঁথিয়া থানার ধোলাউড়ি গ্রামে ডা. আবদুল আওয়ালের বাড়ি ও আশপাশের বাড়িতে হামলা চালিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় ৩০ জনকে। সেখান থেকে চারজনকে ধরে ইছামতি নদীর পারে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। সেখানে শাহজাহান আলীকে জবাই করে ফেলে যাওয়া হলে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি।
আট : ১৬ এপ্রিল ঈশ্বরদী থানার আটপাড়া ও বুথেরগাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে ১৯ জনকে গুলি করে হত্যা।
নয় : ১০ জুন আতাইকুলা থানার মাতপুর গ্রামের মাওলানা কছিমউদ্দিনকে ধরে ইছামতি নদীর পারে নিয়ে হত্যা।
দশ : ৯ আগস্ট পাবনা শহরের নূরপুর ওয়াপদা মোড় থেকে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মাজেদসহ দুজনকে ধরে নিয়ে হত্যার পর পাবনা সুগার মিলের পাশে লাশ ফেলে দেওয়া।
এগারো : ৩ ডিসেম্বর বেড়া থানার বিছাখালী গ্রামে হামলা চালিয়ে ৭০ জনকে হত্যা।
বারো : আগস্টের কোনো একসময় সাঁথিয়ার সোনাতলা গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া।
তেরো : মে মাসে ঢাকার মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিা প্রশিণ কেন্দ্রে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজাকাররা ক্যাম্প স্থাপনের পর সেখানে গোলাম আযম ও নিজামী নিয়মিত যাতায়াত করতেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সলাপরামর্শ করতেন। তারই ফসল হিসেবে সারা দেশে হত্যা ও নির্যাতন।
চৌদ্দ : ৩০ আগস্ট রাতে পুরাতন এমপি হোস্টেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্পে বন্দি জালাল, রুমী, বদিসহ বেশ কয়েকজনকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন নিজামী ও মুজাহিদ। এরপর তাঁদের হত্যা করা হয়।
পনেরো : একই বছরের ৫ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে পাবনার সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে রাজাকার ক্যাম্পে মাঝেমধ্যে যেতেন নিজামী। সেখানে রাজাকার কমান্ডার সামাদ মিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য সলাপরামর্শ করেন।
ষোল : সারা দেশে ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তার দায় নিজামীর। কারণ নিজামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ও আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে ওই সব কর্মকাণ্ডের উসকানিদাতা, মদদদাতা, পরিকল্পনাকারী।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh liberation war, Crimes against huminity, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s