জিয়ার আমলের মন্ত্রী আলীমের বিচার শুরু : সাত ধরনের ১৭ অভিযোগ

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জিয়াউর রহমানের আমলের মন্ত্রী আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। আজ ১১ জুন সোমবার সাত ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ১৭টি ঘটনায় আলীমকে অভিযুক্ত করেন চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। আগামী ৯ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উত্থাপনের মাধ্যমে আলীমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসামি পক্ষকে এ সময়ের মধ্যে তাদের সাক্ষী তালিকা ও নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়।
আজ সকালে আব্দুল আলীমকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অভিযোগ গঠনের সময় তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমাকে শান্তিবাহিনীর সভাপতি ও রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যার কোনো অস্তিত্ব নেই।’ আলীম অভিযোগ করে বলেন, ‘বিএনপির মন্ত্রী থাকায় আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছে।’
অভিযোগ গঠন শেষে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত সাংবাদিকদের কাছে বলেন, আব্দুল আলীম জয়পুরহাটের ডা. আবুল কাশেম হত্যা ও ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধার গণহত্যার সঙ্গে জড়িত।
অন্যদিকে আলীমের আইনজীবী ব্যারিস্টার মুন্সি আহসান কবির বলেন, ‘২৬ জন মুক্তিযোদ্ধার গণহত্যার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সঠিক নয়। কারণ, ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধার সবাই বেঁচে আছেন। আমরা সেটা যথাসময়ে আদালতে উপস্থাপন করবো। তাছাড়া আব্দুল আলীম শান্তিবাহিনীর সভাপতি বা রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার, কোনোটিই ছিলেন না।’
গত ১৫ মার্চ আলীমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছিল প্রসিকিউশন। এতে সাত ধরনের অপরাধের ২৮টি ঘটনায় আলীমের যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল। এর সঙ্গে একাত্তরে হত্যা, লুটসহ আলীমের বিরুদ্ধে তিন হাজার ৯০৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। গত ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-১ আলীমের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আমলে নেয়।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে আনা ২৮টি অভিযোগের মধ্যে ১৭টি আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- জয়পুরহাটের করাইকাদিপুর এলাকার গণহত্যার বর্ণনাসহ চকপাড়া, জুড়িপাড়া, পালপাড়া, সোনাপাড়া এলাকায় ৩৮ জনকে হত্যা, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের।
গত ১৬ এপ্রিল আলীমের মামলাসহ তিনটি মামলা ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। এরপর ২৫ এপ্রিল প্রথম ট্রাইব্যুনাল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মামলাটিও ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছরের ২৭ মার্চ জয়পুরহাটের বাড়ি থেকে আলীমকে গ্রেফতার করা হয়। ৩১ মার্চ তাকে ১ লাখ টাকায় মুচলেকা এবং ছেলে ফয়সাল আলীম ও আইনজীবী তাজুল ইসলামের জিম্মায় জামিন দেয় ট্রাইব্যুনাল। এরপর বেশ কয়েক দফা এই জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সাবেক এই সংসদ সদস্যকে দেওয়া জামিনের অন্য শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- আলীমের পাসপোর্ট জমা থাকবে ট্রাইব্যুনালের নিবন্ধকের কাছে। ছেলে ফয়সাল আলীমের বনানীর বাসায় তাকে থাকতে হবে। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি ছাড়া ঠিকানা বা অবস্থান পরিবর্তন করা যাবে না। গণমাধ্যমে কোনো ধরনের বক্তব্যও দিতে পারবেন না আলীম। মানবতাবিরোধী অপরাধের সাক্ষী, একাত্তরে নির্যাতিত কেউ, ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবার, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে, ফোনে বা ব্যক্তির মাধ্যমে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা যাবে না।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করার পর গ্রেফতার হওয়া ৮ জনের মধ্যে এ নিয়ে মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হলো। এর আগে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে দু’টি ট্রাইব্যুনাল। সাঈদী ও সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণও চলছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়া হবে ২১ জুন।
যত অপরাধ

‘হানাদার বাহিনীর বর্বরতা’ শিরোনামে ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জয়পুরহাট শান্তি কমিটির নেতা জয়পুরহাট ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মুসলিম লীগের আবদুল আলিমকে একদিন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট সাধারন ক্ষমা ঘোষণার পর সংখ্যালঘুদের দেশে ফেরার নিশ্চয়ই আর কেনো বাধা নেই। উত্তরে তিনি বরেছিলেন যে ওদের ক্ষমা নেই। ওরা দেশে ফিরলেই ওদের সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে। শুনে স্তম্ভিত হতে হয়েছে। …বস্তুত ইয়াহিয়া খানের লোক দেখানো ক্ষমা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে যেসব মুষ্টিমেয় সংখ্যালঘু ফিরে এসেছিল তাদের আর পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখতে হয়নি।’

আবদুল আলীম একাত্তরে ছিলেন জয়পুরহাট মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। ওই সময় তিনি ছিলেন কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা। মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রাজাকার রিক্রুট ছাড়াও রাজাকারদের প্রশিক্ষণ শেষে শপথ পড়াতেন আবদুল আলীম। শান্তি কমিটি শান্তিবাহিনী নামেও পরিচিত ছিল।
একাত্তরে জয়পুরহাটে বেশ কজন মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করেছিল হানাদার বাহিনী। চোখ বাঁধা অবস্থায় শহর ঘোরানোর পর তাঁদের হত্যা করা হয়। এর আগে হাত বাঁধা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ছবি তুলেছিল ঘাতকেরা। ছবিতে ওই অভিযানে নেতৃত্বদানকারী মেজর আফজালের পাশে আবদুল আলীমকে দেখা যায় হাস্যোজ্জ্বল দাঁড়ানো অবস্থায়।
১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ঘাতক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যোগসাজশে তাদের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে একাত্তরে প্রাদেশিক পরিষদের তথাকথিত উপনির্বাচনে বগুড়া-১ আসনে দালাল ছয় দলের সম্মিলিত প্রার্থী ছিলেন আবদুল আলীম। বিনা ভোটে ‘নির্বাচিত’ও হন তিনি। (দৈনিক সংগ্রাম ৩১ অক্টোবর ১৯৭১)
একাত্তরে জয়পুরহাট মুক্ত হওয়ার পর সেখানে আবদুল আলীমকে খাঁচায় পুরে সাধারণ মানুষের দেখার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই স্বাধীনতার পর জয়পুরহাটে দালাল আইনে প্রথম মামলাটি হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
জয়পুরহাটের একজন ইউপি চেয়ারম্যান ১৯৯২ সালে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে (১৯৭১ সালের এপ্রিলে) আবদুল আলীমের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা কড়ইকাদিরপুর গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ঘেরাও করে ১৬৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে এবং বাড়িঘরে লুটপাট চালায়।
জাতীয় গণতদন্ত কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জয়পুরহাটের শহীদ ডা. আবুল কাশেমের ছেলে ডা. নজরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, আবদুল আলীমের নির্দেশে ১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই রাতে ডা. আবুল কাশেমকে তাঁর বাসা থেকে ধরে নিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। স্থানীয় শান্তি কমিটির অফিস ও সেনাক্যাম্পে আটক রাখার পর ২৬ জুলাই ডা. আবুল কাশেমকে হত্যা করা হয়েছিল।
আক্কেলপুরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ৭ অক্টোবর পাহাড়পুর সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ধরা পড়লে আলীমের নির্দেশে পরের দিন জয়পুরহাট শহরে ট্রাকের পেছনে বেঁধে নির্যাতনের পর খুন করা হয়। এ ছাড়া জয়পুরহাট সীমান্তবর্তী পাগলা দেওয়ানে শত শত শরণার্থী হত্যাসহ নির্যাতন করার অভিযোগ আছে আলীমের বিরুদ্ধে।
জয়পুরহাটের মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলী গণতদন্ত কমিশনকে জানান, একাত্তরের ৫ ডিসেম্বর সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তিনি এলাকায় ঢুকেছিলেন। সেদিনই তাঁরা শান্তি কমিটির কার্যালয় দখল করে হত্যার জন্য চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের তালিকাসহ বেশ কিছু তালিকা উদ্ধার করেন। একটি দলিলে আবদুল আলীমের সই ছিল।

প্রসিকিউশন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের যে ১৭ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে, সেগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
মেহের উদ্দিনের বাড়িতে লুটপাট-আগুন
প্রসিকিউশন অভিযোগ এনেছে, একাত্তরের ২০ এপ্রিল বিকেল ৫টার দিকে আলীমের নেতৃত্বে পাঁচবিবি থানার দমদমা গ্রামের মেহেরউদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে হামলা চালায় রাজাকার বাহিনী। এরপর বাড়ির সব মালামাল লুট করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনার পর মেহেরউদ্দিন তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হন।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩৭০ জনকে গুলি করে হত্যা
১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলীমের নেতৃত্বাধীন রাজাকার বাহিনীসহ পাকিস্তানী সেনারা জয়পুরহাটের কড়ইকাদিপুর এলাকার কড়ই, কাদিপুর প্রকাশ কাদিপাড়া, চকপাড়া, সোনার পাড়া, পালপাড়া ও যুগীপাড়া হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে হামলা চালায়। এরপর সেখানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর অনেককে আটক করে তারা। পরে কাদিপুর আখের চুল্লির কাছে ৭০ জন, কাদিপুর ডোমপুকুরে ৯০ জন, চকপাড়ার কুড়ালপুরে ২৬ জন ও চকপাড়া কুড়ালপুরের কাছে রাস্তার উত্তর পাশে ৫ জনকে সহ মোট ৩৭০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন।
পাহনন্দা গণহত্যা
একাত্তরের আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহে আলীমের পরামর্শ ও প্ররোচনায় এবং চিরোলা গ্রামের শান্তি কমিটির সদস্য রিয়াজ মৃধার সহাযোগিতায় ১১ জন পাকিস্তানি সেনা নওপাড়া, চরবরকত ও চিলোরা গ্রামের আনুমানিক ৫০০ জনকে আটক করে। এরপর আলীমের দেওয়া তালিকা দেখে আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের আত্মীয় ২৮ জনকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই ২৮ জনকে পিছমোড়া করে বেঁধে আফাজের বাড়ির মাটির ঘরে নিয়ে গুলি করা হয়। তাদের মধ্যে ২২ জনকে নিহত হলেও ৬ জন প্রাণে বেঁচে যান।
পাঁচবিবিতে ১৯ জনকে হত্যা
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একদিন আব্দুল আলীম একটি ট্রেনে করে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে পাঁচবিবি বকুলতলা রেললাইনের কাছে নামেন। এরপর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে কোকতারা, ঘোড়াপা, বাগজানা ও কুটাহারা গ্রামে হানা দিয়ে বাড়িঘরে লুটপাট চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখান থেকে ১৯ জনকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যাও করা হয়।
মিশন স্কুলে ৬৭ জন হিন্দুকে হত্যা
একাত্তরের বৈশাখ মাসের শেষ দিকে জয়পুরহাটের দক্ষিণ পাহুনন্দা মিশন স্কুলে আসামি আব্দুল আলীমের নির্দেশে ও প্ররোচনায় ৬৭ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। এরপর স্থানীয়দের ডেকে এনে স্কুলের পশ্চিম পাশে বাঙ্কার খুঁড়িয়ে ওই ৬৭ জন হিন্দুর লাশ মাটি চাপা দেওয়া হয়।
ছালামসহ ৯ জনকে হত্যা
একাত্তরের মে মাসের প্রথম দিকে জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে আব্দুস ছালাম, আব্দুল কুদ্দুস, সমিরউদ্দিন মণ্ডল, আবুল হোসেন মাঝি, আজিম হোসেনমাঝি, আব্দুর রহমান মে¤¦ার, এবারত আলী মণ্ডল, আব্দুস ছাত্তার ও ফজলুর রহমানসহ ১০ জনকে আটক করা হয়। এরপর তাদের পাকিস্তান সেনাবহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে এদের পাঁচবিবি থানার বাগজানা পুরনো রেলওয়ে স্টেশনের কাছে কোকতারা বকুলতলার পুকুর পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে মোফাজ্জল নামে একজন প্রাণে বেঁচে যান।
ইলিয়াসসহ ৪ জনকে অপহরণ করে হত্যা
একাত্তরের ২৬ মে নওদা গ্রামের ইলিয়াসউদ্দিন সরদার, ইউসুফ উদ্দিন সরদার, ইউনুস উদ্দিন সরদার ও আবুল কাদের মোল্লাকে অপহরণ করা হয়। এরপর আব্দুল আলীমের পরামর্শে ও প্ররোচনায় ওই দিন সন্ধ্যায় কালী সাহার পুকুর পাড়ে নিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়।
ক্ষেতলাল গণহত্যা
একাত্তরের মে মাসের শেষের দিকে ক্ষেতলাল হিন্দুপল্লী, উত্তরহাট শহর, হারুনজাহাটসহ বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে রাজাকার বাহিনী। আলীমের নির্দেশে বাদল, সচীন ওরফে ভানু, প্রবাস চন্দ্র শীল, মনিভূষণ চক্রবর্তী, কার্তিক চন্দ্র বর্মণ, নিমাই চন্দ্র বর্মণ ও প্রিয়নাথ বর্মণসহ অপরিচিত আরও তিন জনকে হত্যা করা হয়। প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, রোজার ঈদের আগে ক্ষেতলাল থানার উত্তরহাট শহরহাটের পশ্চিম পাশে একটি জনসভার আয়োজন করা হয়। পাকিস্তন সেনাবাহিনীর মেজর আফজালসহ বহু সেনাসদস্য ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, আলীম ওই জনসভায় বলেন, “আগামী ঈদে আমরা কলকাতা গড়ের মাঠে নামাজ পড়ব। সাধারণ মানুষের সাহস বৃদ্ধির জন্য হিন্দুদের ক্ষমা করা যাবে না। এদের যা পাও লুট করে নাও।”
পশ্চিম আমট্রা গ্রামে গণহত্যা
একাত্তরের ১৪ জুন বগুড়ার খোকন পাইকারসহ ১৫ জন যুবক জয়পুরহাটের আক্কেলপুর হয়ে ভারতে যাওয়ার পথে শান্তি কমিটির লোকজনের হাতে ধরা পড়েন। এরপর আলীমের নির্দেশে আক্কেলপুরের পশ্চিম আমট্রা গ্রামে এনে তাদেরকে হাত-পা বেধে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হয়। এরপর ওই গ্রামের ময়েন তালুকদারের ছেলেকে ধরে এনে গর্ত করে লাশগুলো মাটি চাপা দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
জয়পুরহাট কলেজে ২৬ যুবককে হত্যা
একাত্তরের জুন মাসের শেষের দিকে আব্দুল আলীম জয়পুরহাট সদর রোডের শওনলাল বাজলার গদিঘরে শান্তি কমিটির অফিসে বসে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সন্দেহে পাহাড়পুর থেকে ধরে আনা ২৬ যুবককে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর দুটি ট্রাকে করে ওই যুবকদের জয়পুরহাট রেলস্টেশনের পশ্চিমে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে ছবি তোলা হয়। ছবিসহ নেগেটিভগুলো আলীম নিয়ে গেলেও স্থানীয় ‘আলোখেলা’ স্টুডিওর মালিক এইচ এম মোতাছিম বিল্লাহ কয়েকটি ছবি নিজের কাছে রেখে দেন। ছবি তোলার পর ওই ২৬ যুবককে ট্রাকে তুলে জয়পুরহাট সরকারী কলেজে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
গাড়োয়ালদের হত্যা
মুক্তিযুদ্ধের সময় জুন মাসের শেষের দিকে কয়েকজন গাড়োয়াল এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনসহ মোট ২৬ জনকে আটক করা হয়। এরপর আলীমের নির্দেশে খঞ্জনপুর কুঠিবাড়ি ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
ডা. আবুল কাশেম হত্যা
একাত্তরে ২৪ জুলাই ডাক্তার আবুল কাশেমকে অপহরণ করা হয়। এরপর তাকে আটকে রেখে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। আলীমের নির্দেশে ২৬ জুলাই তাকে খঞ্জনপুর ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
১১ যুবককে হত্যা
একাত্তরের সেপ্টেম্বরে দুটি ট্রাকে করে মুখে কালিমাখানো ১১ জন যুবককে জয়পুরহাট থানা রোডের আজিমউদ্দিন সরদারের বাড়ির সামনে নিয়ে আসা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা তাদের সরকারি ডিগ্রি কলেজে নিয়ে যায়। সেখানে আব্দুল আলীমের নির্দেশে ওই ১১ যুবককে ট্রাক থেকে নামিয়ে বারঘাটি পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী।
ফজলুল করিমসহ ৩ জনকে হত্যা
একাত্তরের ৭ অক্টোবর আক্কেলুপুর সদরের ফজলুল করিম ও অন্য ২ জনকে আটক করে আলীমের নির্দেশে মুখে চুনকালি লাগিয়ে জয়পুরহাট শহর প্রদক্ষিণ করানো হয়। পরে তাদের খঞ্জনপুর কুঠিবাড়ি ঘাটে নিয়ে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
চিনিকলে হত্যা
একাত্তরের ২৫ আগস্ট পাঁচবিবি থানার সোলেমান আলী ফকির এবং তার দুই বন্ধু আব্দুস সামাদ মণ্ডল ও উমর আলী মণ্ডলকে পাঁচবিবি বাজারে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর আলীমের নির্দেশে তাদের ওপর নির্যাতন চলে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনাদের ওই ক্যাম্পে আরও ২৫ জনকে আগে থেকেই আটকে রাখা হয়েছিল। আসামি আলীম ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল চিনি কলের ক্লাবঘরে ‘কোর্ট’ বসিয়ে তাদের ‘মৃত্যুদণ্ড’ দেয়। ওই ২৫ জনের মধ্যে ৮ রাতে পর্যায়ক্রমে ২৩ জনকে হত্যা করা হয় এরপর। সোলেমান ফকিরসহ বাকি ৪ জনকে ছেড়ে দিলে তারা নিরাপত্তার জন্য ভারতে চলে যান।
আক্কেলপুরে উস্কানিমূলক বক্তব্য
প্রসিকিউশন বলছে, আসামি আব্দুল আলীম একাত্তরে আক্কেলপুরের বিভিন্ন স্থানে উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন। তিনি সোলায়মান আলী ফকিরের মিল প্রাঙ্গণ, আক্কেলপুর রেলওয়ে স্টেশন, বিভিন্ন মাদ্রাসায় স্থাপিত সেনাক্যাম্প, শান্তি কমিটির অফিস ও দুর্গাবাবুর দালানঘরে উস্কানিমূলক রাখেন। এতে করে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মানবতাবিরোধী অপরাধে উৎসাহিত হয় বলে উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।
জব্বল হত্যা
চট্টগ্রামের কালুরঘাটের ১৭ উইংয়ের ইপিআর সুবেদার মেজর জব্বল হোসেন মুক্তিযুদ্ধে গুরুতর আহত অবস্থায় পাঁচবিবি ধুরইল গ্রামের নাজিমউদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। খবর পেয়ে রাজাকাররা ওই বাড়ি ঘেরাও করে জব্বলকে অপহরণ করে। পরে আব্দুল আলীমের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।
১৯৫৮ সালে মুসলিম লীগে যোগদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন আলীম।
আবদুল আলীমকে ২০১১ সালের ২৭ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই দিনই তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্যের বিচারক প্যানেল এ পরোয়ানা জারি করে।  ট্রাইব্যুনাল আবদুল আলীমকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) আদেশ দেন। গ্রেপ্তারের আদেশ ২৭ মার্চ দুপুরেই জয়পুরহাটে পৌঁছে। রাত ৯টা ৫ মিনিটে আবদুল আলীমকে গ্রেপ্তার করে জয়পুরহাট জেলা পুলিশ।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh liberation war, Crimes against huminity, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s