সিআইএর গোপন দলিল [ডেটলাইন : ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১] পশ্চিম পাকিস্তানও ভেঙে যেতে পারে

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি মুক্তিবাহিনীর হাতেই ক্রমাগত নাস্তানাবুদ হচ্ছিল হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। যতই দিন যাচ্ছিল ততই কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল পাকিস্তানি সেনারা। আর ডিসেম্বরের ৩ তারিখে ভারতে বিমান হামলা চালিয়ে তারা নিজেদের পরাজয়কেই আরো এগিয়ে নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের মুরবি্বরাও নিশ্চিত হয়ে যায় যে, পাকিস্তানের পরাজয় কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। ওই অবস্থায় পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে নতুন হিসাব-নিকাশ। পাকিস্তানিরা হেরে গেলে এ অঞ্চলের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কতখানি ক্ষুণ্ন হবে_এসব নিয়ে শুরু হয় বিচার-বিশ্লেষণ। সেরকমই একটি বিশ্লেষণমূলক দলিল হলো মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখের গোপন প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কাও ব্যক্ত করা হয় যে, যুদ্ধে হেরে গেলে পশ্চিম পাকিস্তানও ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে।
‘ইমপ্লিকেশনস অব অ্যান ইন্ডিয়ান ভিক্টরি ওভার পাকিস্তান’ শিরোনামের এ দলিলের শুরুতেই ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখের একটি গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর দেশের যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে তিনটি বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এগুলো হলো_
ক. বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
খ. পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চল ভারতের দখলে নিয়ে নেওয়া।
গ. পাকিস্তানি সাঁজোয়া ও বিমানবাহিনীর শক্তি এমনভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া, যাতে পাকিস্তান আর কখনোই ভারতের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিতে না পারে।
এ লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে ধরে নিয়ে উপমহাদেশ এবং অন্যান্য শক্তির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে সিআইএ।
‘উপমহাদেশে যুদ্ধ-পরবর্তী সামগ্রিক পরিস্থিতি’ উপশিরোনামে দলিলে পরের অংশে বলা হয়, এর ফলে নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় শক্তি হবে ভারত। তবে এ যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে দরকার হবে বাইরে থেকে আরো বেশি পরিমাণ অর্থনৈতিক সহায়তার।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে দলিলে বলা হয়, বাংলাদেশ ভারতের অনুগত একটি দেশ হিসেবে আবির্ভূত হবে। ভারত দেশটির ওপর সর্বোচ্চ প্রভাব খাটানোর অবস্থায় থাকবে; তবে ভারতের তেমন কোনো ইচ্ছা নেই এবং নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ফলাতে পারবেও না। রিপোর্টে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন বাঙালি জাতীয়তা অদূর ভবিষ্যতে এমন মাত্রায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বলে সিআইএ মনে করে না, যাতে পশ্চিমবঙ্গ ভারত থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে পারে।
পাকিস্তান প্রসঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়, যুদ্ধে হেরে গিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়বে পশ্চিম পাকিস্তান। যুদ্ধে দেশটির অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিকভাবেও সংকটের মুখে পড়বে দেশটি। এমনিতেই দেশটিতে আঞ্চলিক বিরোধ তুঙ্গে। এত বড় পরাজয়ের ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এমনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে যে, পশ্চিম পাকিস্তান তিন বা চার টুকরো হয়ে যেতে পারে।
রিপোর্টে আরো বলা হয়, মিসেস গান্ধীর লক্ষ্য যাই হোক না কেন, ভারত সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানকে হারিয়ে দেবে (বা দিতে পারবে) বলে মনে হয় না। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে পশ্চিমাংশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্তি অটুট থাকলেও সেখানে বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা রোধ করার সামর্থ্য ওই বাহিনীর নাও থাকতে পারে। পরাজয়ের ফলে ইয়াহিয়া ও তাঁর সহযোগীরা এতটাই বদনামের ভাগিদার হবে যে, দেশটির নেতৃত্বে অন্য কেউ চলে আসবে। তবে সেনাবাহিনী দেশের ঐক্য বজায় রাখার চেষ্টা করতে পারে।
১২ পৃষ্ঠার এ রিপোর্টটি ডিক্লাসিফায়েড করা হয় ২০০৫ সালের ৯ জুন। রিপোর্টে যুদ্ধের পর আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো বিশ্বশক্তির ভারসাম্য কী হতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh liberation war, History

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s