রাজাকার নিয়ে বিরোধ দালালে দালালে

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার-আলবদরদের নৃশংসতা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে স্থানীয় অন্য দালালরাও তা পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও নূরুল আমীনের নেতৃত্বাধীন পিডিপি দেশের জনগণের ওপর জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, খুন, জখম, লুটতরাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো গোপন রিপোর্টে এর প্রমাণ রয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে ১৯৭১ সালে প্রদেশের তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে মাসে দু’বার গোপন প্রতিবেদন পাঠানো হতো ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের কাছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ইস্ট পাকিস্তান’।
সে বছর অক্টোবর মাসের প্রথম পরে রিপোর্টে উল্লেখ আছে, ৩ অক্টোবর ঢাকায় নূরুল আমীনের বাসায় তার সভাপতিত্বে পিডিপি নির্বাহী কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্রমাবনতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে আলোচনাশেষে আসন্ন উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের পে মত দেওয়া হয়। ওই সভায় কয়েকজন বক্তা গ্রামাঞ্চলে নিরীহ জনগণের ওপর জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও রাজাকারদের নৃশংসতার বিষয়টি তুলে ধরেন। রিপোর্টটির স্মারক নং 686(172)-Poll./S(1). এতে বলা হয়েছে, An extended meeting (50) of the Executive Committee of East Pakistan Regional PDP was held on 3-10-71 at the Dacca residence of Mr Nurul Amin with himself in the chair. The meeting discussed the present political situation and deteriorating economic condition of the country and favoured participation in the ensuing by-elctions. Some of the speakers mentioned about the atrocities committed by the enemies as well as by the Jamaat-e-Islami workers and Razakars on innocent people in the rural areas.
শান্তি কমিটিতে জামায়াত ছাড়াও মুসলিম লীগের বিভিন্ন গ্রুপ, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ বেশকিছু দল অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে জামায়াত ছাড়া অন্য কোনো দলের পক্ষ থেকে সামরিক জান্তাকে রাজাকার বাহিনীর মতো ঘাতক বাহিনী গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়নি।
রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতার সমালোচনা করেন তখন পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন রাজনীতিকও। এ নিয়ে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে তাদের বাগযুদ্ধও হয়েছে। হতে পারে সেটা ছিল ক্ষমতার হিস্যা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের। তবুও এর মধ্য দিয়ে প্রকৃত ঘটনা কিছুটা হলেও প্রকাশ হয়ে পড়ে।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের কাছে মতা হস্তান্তর না করার জন্য ইয়াহিয়া খানের চক্রান্তে পূর্ণ সহযোগিতা করেছিলেন। কিন্তু ২৫ মার্চ বাংলাদেশে গণহত্যা শুরুর পর তিনি এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানেও মতার ভাগ থেকে বঞ্চিত হন। সামরিক শাসকদের প্রধান দোসর হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আবির্ভাবে তিনি স্পষ্টতই নাখোশ ছিলেন। রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি কর্তৃক পাকিস্তানি হত্যা বন্ধ করতে হবে।’ এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গোলাম আযম বলেছিলেন, ‘ভুট্টো কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণ করে পূর্ব পাকিস্তানিদের বোকা বানাতে পারবেন না।’
সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল আসগর খান পূর্ব পাকিস্তানে রাজাকার বাহিনীর কাজের সমালোচনা করলে তার জবাবে জামায়াতের দলীয় মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম ২ অক্টোবর ‘রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচার আর নয়’ শিরোনামে এক সম্পাদকীয়তে আসগর খানকে কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে। এতে লেখা হয়, ‘শান্তি কমিটি এবং রাজাকার-আলবদর বাহিনী ও মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যরা বুকের রক্ত দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করছে।’ আসগর খানের প্রতি তাদের ক্ষোভের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, তাকে ‘হিন্দুস্তানের দালাল’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়।
জামায়াতে ইসলামী রাজাকার বাহিনী গঠনের পর এর সদস্য সংখ্যা আরো বাড়ানো এবং তাদের ভারী অস্ত্রে সজ্জিত করার দাবি তোলে। দেশের সর্বত্র মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বাড়ছে এ খবর দিয়ে সংগ্রামে ৭ অক্টোবর লেখা হয়, ‘প্রদেশের অভ্যন্তরে দষ্কৃতকারীদের নির্মূল করতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নির্ভরযোগ্য লোকের মাধ্যমে রেজাকার বাহিনী গঠন এর মোম হাতিয়ার। রাজাকারদের ভারী অস্ত্র দেওয়াও আবশ্যক।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালনকালে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তিন রাজাকারের মৃত্যুতে সংগ্রাম-এ ১১ অক্টোবর সম্পাদকীয় লেখা হয় ‘গৌরবের মৃত্যু’ শিরোনামে। এতেও ‘রাজাকার বাহিনীকে দষ্কৃতিকারীদের দমনে আরো অধিক কলাকৌশল শিাদানের পদপে গ্রহণ এবং ভারী অস্ত্র প্রদানের’ অনুরোধ জানানো হয়।
রাজাকার ও আলবদর বাহিনী জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে- ক্রমাগত এ অভিযোগ উঠতে থাকায় দলের ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক ১৪ অক্টোবর এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এ বাহিনী বিশেষ কোনো দলের নয়, বরং সামরিক কর্তৃপরে নিয়ন্ত্রণাধীন।’ তিনি রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ না এনে তাদের প্রশংসা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
পিপিপি-প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ছাড়াও একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনায় মুখর ছিলেন পিপিপির তথ্য সম্পাদক মাওলানা কাওসার নিয়াজি, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার মার্শাল আসগর খান প্রমুখ। রাজাকার নিয়ে ভুট্টো ও গোলাম আযমের বাহাসের কথা আগেই বলা হয়েছে। জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এ আসগর খানকে ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ এবং ‘হিন্দুস্তানের দালাল’ আখ্যা দেওয়া হয়। অন্যদিকে কাওসার নিয়াজি অভিযোগ করেন, ‘গোলাম আযমকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীকে একটি দেশপ্রেমিক জাতীয় দল বলে আখ্যায়িত করা হয় অথচ এটা বাস্তব অবস্থার বিপরীত।’ (দৈনিক সংগ্রাম, ৯ নভেম্বর ১৯৭১)
রাজাকার বাহিনীতে জামায়াতের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য নিয়েই মূলত দালালদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। জামায়াতের প্রাধান্যের বিষয়টিকে জায়েজ করার জন্যও জামায়াত নেতাদের কসরতের কমতি ছিল না। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল এডুকেশন সেন্টারে রেজাকার শিবির পরিদর্শনকালে’ গোলাম আযম বলেন, ‘কোন দলের লোক কম বা কোন দলের বেশী লোক রেজাকার বাহিনীতে থাকতে পারে কিন্তু রেজাকাররা দলমতের ঊর্ধে পাকিস্তানে বিশ্বাসী সকল দলকে আপন মনে করে।’
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তখনকার জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার উইটনেস টু সারেন্ডার বইয়ে লিখেছেন, ‘সেপ্টেম্বরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত একটি রাজনৈতিক দল জেনারেল নিয়াজির কাছে এই বলে অভিযোগ করে যে, জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত লোকদের নিয়ে তিনি একটি সেনাবাহিনী গঠন করেছেন। এরপর জেনারেল আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে বলেন, এখন থেকে রাজাকারদের তুমি আল-বদর ও আল-শামস নামে ডাকবে যাতে এমন ধারণা দেওয়া যায় যে এরা একক কোনো দলের নয়।’
রাজাকারদের নৃশংসতা নিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো, কাওসার নিয়াজি, আসগর খান প্রমুখ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতার সমালোচনামূলক মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আলী আহসান মুজাহিদ। তিনি বলেন, ‘জাতি রক্ষার জন্য তারা (রাজাকাররা) এগিয়ে এসেছে।’

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh liberation war, Crimes against huminity, History, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s