বিদ্যুত সঙ্কট : সহজ সমাধানে মনোযোগ নেই সরকারের

চলতি সপ্তাহেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) যাচ্ছে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব। এতে প্রায় ৩০ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব থাকতে পারে বলে বিইআরসি সুত্র জানিয়েছে। জুলাই মাস থেকে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম একই সঙ্গে বাড়াতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিইআরসির এক সুত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। পাইকারি দাম বাড়ালে সংস্থাগুলো ক্ষতির মূখে পড়বে। সে কারণে পাইকারি দাম বাড়ানোর পরে খুচরা দাম বাড়ানোর বিষয়টি সামনে চলে আসবে। সর্বশেষ ২৯ মার্চ দাম বাড়ানোর ফলে বর্তমানে বিদ্যুতের পাইকারি গড় দর রয়েছে ৪ টাকা ০২ পয়সা। ওই সময়ে পিডিবি থেকে বলা হয়েছিলো, মার্চে তাদের প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ পড়েছে ৫ দশমিক ৭০ টাকা। যা বর্তমানে ৬ টাকার ওপরে বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে।
বর্তমান সরকার এ পর্যন্ত ৫ দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। প্রথম দফায় ২০১০ সালের মার্চে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ায়। এরপর ১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খুচরা ও পাইকারি দাম বাড়ায়। এরপর একই বছরের ডিসেম্বর মাসে পাইকারি দর ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ দশমিক ২৭ টাকা করা হয়। এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ৭ দশমিক ০৯ শতাংশ দাম বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৪ টাকা করা হয় এবং সর্বশেষ মার্চে ইউনিট প্রতি আটাশ পয়সা বাড়িয়ে ৪ দশমিক ০২ টাকা করা হয়। এ ছাড়া গ্রাহক পর্যায়ে ২০১০ সালের মার্চ মাসে ও ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্তবর্তীকালীন ৫ শতাংশ এবং ডিসেম্বর মাসে দাম বাড়ানো হয়। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দাম বাড়ায় বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের গড় দর রয়েছে ৫ দশমিক ৩২ টাকা।

দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়ার আশায় সরকার ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করার প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়ায় জ্বালানি বাবদ বেশি খরচের ভারে এখন দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। অথচ কম সময়ে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ ছিল। তুষ থেকে সস্তায় সহজে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপায় বাংলাদেশেই উদ্ভাবিত হয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে তুষ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছেও। তুষ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সরকারের তেমন বড় অঙ্কের বিনিয়োগেরও প্রয়োজন হবে না। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দিয়েই এ ধরনের প্লান্ট চালু করা যায়। সেক্ষেত্রে সরকারকে শুধু সাবস্টেশনের মাধ্যমে ওই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ করে দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ কম হওয়ায় মোটা অঙ্কের কমিশন বাগানোর সুযোগ নেই। এ কারণেই কি সরকার ও সংশ্লিষ্ট আমলা-প্রকৌশলীরা এ দিকে মনোযোগ দিতে আগ্রহ বোধ করেন না? বর্তমানে সরকার নিয়ম করেছে, বাসা-বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে হলে সোলার প্যানেল লাগাতে হয়। কিন্তু ওইসব বাসা-বাড়িতে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। এতে সৌরবিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

যশোরের শিল্প শহর নওয়াপাড়ায়  তৈরী হচ্ছে তুষ দিয়ে বিদ্যুৎ। দেশে  বিদ্যুতের তীব্র সংকট মুহুর্তে এখান থেকে ৪০০ কিলো ওয়াট বিদ্যুৎ তৈরী হচ্ছে। এই বিদ্যুৎ একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করে প্রতিমাসে ৩লাখ টাকা সাশ্রয় করছে।ফার্নেস ওয়েল দিয়ে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টগুলি এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য কোন ভুমিকা রাখতে পারেনি। সেই ক্ষেত্রে বেসরকারীভাবে তুষ দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরীর মাধ্যমে চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় অপার সম্ভাবনার এক  উজ্জল দূষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ধানের তুষ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রথম শুরু হয় গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। কাপাসিয়া উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের গিয়াসপুর গ্রামে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্ট বায়োম্যাস সিফিকেশন সিস্টেমে ধানের তুষ থেকে গ্যাস উৎপাদন করে তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ২০০৩ সালে ওই গ্রামের ছেলে আসাদুজ্জামান মানিক বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এ কার্যক্রম শুরু করেন। ২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা তপন চৌধুরী ৪০০ কেভিএ ক্ষমতা সম্পন্ন বায়োম্যাস প্রজেক্ট ড্রিম্স পাওয়ার লিঃ উদ্বোধন করেন। বায়োম্যাস গ্যাসিফিকেশনের মাধ্যমে ধানের তুষকে অর্ধেক পুড়িয়ে গ্যাস উৎপাদন করার পর ওয়াটার প্রুফ ট্যাংকের মধ্যে প্রবাহিত করে পর্যায়ক্রমে কাঠের শুকনো গুঁড়া ভর্তি ৪টি ফিল্টার অতিক্রম করিয়ে ফাইনাল ফিল্টারে শতভাগ ঠাণ্ডা ও বিশুদ্ধ গ্যাসে পরিণত করা হয়। পরে একে ডিজেল ইঞ্জিনে প্রবাহিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এখান থেকে প্রথমে মেইন ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ডে যায়, পরে পর্যায়ক্রমে ৪৪০ থেকে ২২০টি লাইনে প্রবাহিত করে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সেচ প্রকল্প, আঁখ মাড়াই, পোল্ট্রি ফার্ম, মসলা উৎপাদন মেশিন, ডিশ লাইন, মোবাইল টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।ড্রিম্স পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আসাদুজ্জামান মানিক বলেন, বর্তমানে আশেপাশের ৭টি গ্রামে প্রায় ১৫ কিলোমিটার লাইন টেনে ৪৫০ জন গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেয়া সম্ভব হচ্ছে। এ স্টেশনের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৪০০ কেভিএ হলেও মাত্র ৫২ কেভিএ বিদ্যুৎ ব্যবহারে আসছে যা মোট উৎপাদনের ২০ ভাগ। বাকী ৮০ ভাগ বিদ্যুৎই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পুরো মাত্রায় এ স্টেশনটিকে সচল করে শতভাগ বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে না পারলে এ স্টেশন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। সরকার যদি জাতীয় গ্রিডে অথবা নিকটবর্তী ট্রান্সফরমারে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে এখান থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে অফপিক আওয়ারে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ফেরত দেয়, তবে সরকার এবং এ প্রতিষ্ঠান উভয়ে লাভবান হবে। মানিক আরো দাবি করেন মাত্র আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এরকম স্টেশন স্থাপন করে সরকার যদি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দিয়ে পরিচালনা করে তবে সারা দেশের বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Economy, Environment, Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s