নূতন চন্দ্রের ছেলের জবানবন্দি : বাবাকে তিনটি গুলি করেন সাকা চৌধুরী

দানবীর নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে তাঁর ছেলে প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ আজ ২০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, ‘একাত্তরের ১৩ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে কুণ্ডেশ্বরীতে আমাদের বাসভবনে ঢুকে আমার বাবাকে হত্যা করেন। তারা আমার বাবাকে মন্দির থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে, তিনি তখন ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে তিনটি গুলি করেন।’ প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দিতে বলেন, বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যার কথা আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নূতন চন্দ্র নিজে দেশে থেকে গেলেও সন্তানদের ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন সত্তরোর্ধ্ব প্রফুল্ল। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সকাল আনুমানিক ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় আমার বাবাকে মন্দিরের ভেতর থেকে টেনেহিঁচড়ে মন্দিরের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। যখন আমার বাবা ছটফট করছিলেন, তখন আর্মিদের সঙ্গে থাকা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পিস্তল দিয়ে তাঁকে আরো দু-তিনটি গুলি করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ কথা আমার দাদা চিত্তরঞ্জন সিংহ ও ব্রজহরি কর্মকারের কাছ থেকে শুনেছি।’
বাবার মুখে আগুনটুকু দিতে পারলাম না : ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাকা চৌধুরীর মামলায় জবানবন্দি দেন প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ। জবানবন্দি দেওয়ার একপর্যায়ে তিনি আবেগ-আপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমরা এতই অভাগা ছেলে যে বাবার মরদেহ দাহ করতে পারিনি। হিন্দু ধর্মের প্রথা অনুযায়ী সৎকারের সময় বাবার মুখে আগুনটুকু দিতে পারলাম না।’
প্রফুল্ল রঞ্জন বলেন, ‘বজ্রহরি আমাকে জানান, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে ব্রজহরিসহ পাঁচজন আমার বাবাকে বাড়ি থেকে সরানোর জন্য জোর করছিলেন। এ সময় তাঁরা পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে (সে সময়ের স্বঘোষিত মেজর বা ব্রিগেডিয়ার) সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে আসতে দেখেন। তাদের দেখে তিনজন জঙ্গলের দিকে আর দুজন বাড়ির ওপরে উঠে পালিয়ে থাকেন। ব্রজহরি ওপর থেকে দেখেন, তারা বাবার কাছে এসে টাকা ও সোনা দাবি করে। বাবা তাদের সোনা দিলে তারা চলে যায়। কিন্তু তারা ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে আবার ফিরে আসে। পরে তাঁকে মন্দির থেকে বের করে হত্যা করে। আমার বাবাকে গুলি করে মারার পর তাঁর লাশ তিন দিন পড়ে ছিল ওই মন্দিরের সামনে। পরে এলাকার চেয়ারম্যান আমনত খাঁসহ পাশের গ্রামের বড়ুয়ারা এসে আমার বাবাকে সৎকার করেছেন বলে শুনেছি।’
নূতন চন্দ্রের ছেলে বলেন, ‘আমার বাবা বার্মাতে থাকতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। এরপর ১৯৪৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম এবং কলকাতায় ওষুধ ও সাবানের কারখানা স্থাপন করেন। ১৯৫২ সালে ভারত বিভক্তির পর পাসপোর্ট প্রথা চালু হলে আমার বাবা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে থেকে যান। তিনি চট্টগ্রামে বিভিন্ন মন্দির, স্কুল ও একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।’ প্রফুল্ল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনের পর সারা পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন শুরু হয়, যার ঢেউ রাউজানেও এসে লাগে। এ সময় আমি, আমার মেজো ভাই সত্য রঞ্জন, আবদুল ওহাব, নুরুল আমিন, আবদুল্লাহ আল নোমানসহ আমরা আবদুল্লাহ আল হারুনের নেতৃত্বে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হই।’ তিনি বলেন, ‘২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা আমরা পরের দিন এলাকার মাইকে শুনতে পাই। ২৫ মার্চ রাত থেকেই নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। ১১ এপ্রিল বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান আমাদের বাড়িতে আসেন। তিনি আমাকে বলেন, তোমাকে এখনই পালিয়ে যেতে হবে, নইলে পাক বাহিনী তোমাকে মেরে ফেলবে। তুমি পালিয়ে যাও। তার কথায় আমার স্ত্রী-সন্তান, দাদার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও দিদির ছেলে-মেয়ে নিয়ে দুটি জিপগাড়িতে করে ভারতের রামগড় হয়ে সাবলুমের দিকে রওনা হই। সাবলুমে সবাইকে রেখে আমি আবার রামগড়ে এসে বাংলাদেশ সরকারের পে পাসপোর্ট ইস্যু করতে থাকি। এ সময় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কিছু শরণার্থী আমাকে বলে, আপনি কি আপনার পরিবারের খবর জানেন? আমি বললাম, না। তখন তাদের মধ্য থেকে কেউ বলল, আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। কেউ বলল, গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্কুল হেডমাস্টার যতীশ ধর বললেন, হত্যা করা হয়েছে। পরে আমি দেশে এসে পুরো ঘটনা জানতে পারি।’
এর আগে গত ৪ জুন আরেক সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে জানান, তিনি সালাউদ্দিন কাদেরকে পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে কুণ্ডেশ্বীতে ঢুকতে দেখেন এবং এরপরই গুলির শব্দ পান।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে নূতন চন্দ্র সিংহ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর রোষানলে পড়েন বলে দাবি করেন প্রফুল্ল।
চট্টগ্রামের রাউজানে কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয় ও কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যাসহ একাত্তরে মানবতাবিরোধী ২৩টি অপরাধের ঘটনায় সালাউদ্দিন কাদেরের বিচার চলছে।
প্রফুল্ল চন্দ্র সিংহ জানান, ১৯৭০ এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবির পর থেকে ফজলুল কাদের চৌধুরী তার বাবাকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা ছিলাম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায়। প্রতি নির্বাচনের আগে ফজলুল কাদের চৌধুরী ওই এলাকায় আসতেন এবং বলতেন ‘তোমরা ভোট কেন্দ্রে যেয়ো না। তাহলেই আমি বুঝব, তোমরা আমাকে ভোট দিয়েছ’।কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে আমাদের ওপর নির্যাতন করা হতো।”
১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাউজানে গিয়ে নূতন চন্দ্র সিংহের বাড়িতে গিয়েছিলেন। এতেও ফজলুল কাদের চৌধুরী ক্ষুব্ধ হন বলে জানান প্রফুল্ল। মুসলিম লীগের প্রার্থী ফজলুল কাদের চৌধুরী সত্তরের ওই নির্বাচনের আগের রাতে তিনবার তাদের এলাকায় যান বলে জানান তিনি।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Crimes against huminity, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s