আলবদেরর হোতা মুজাহিদের বিচার শুরু : গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সাত অভিযোগ

মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এবার অভিযুক্ত হলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল ২১ জুন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদেশ দেয়। আগামী ১৯ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও দেশত্যাগে বাধ্য করার সাত ঘটনায় মুজাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মুজাহিদের বিচার শুরু হলো। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত দুটি ট্রাইব্যুনালে এ নিয়ে আটটি মামলার বিচার শুরু হলো। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। ট্রাইব্যুনাল-২ অভিযোগ গঠন করে জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা এবং জিয়ার আমলের মন্ত্রী আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে।
বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এ গতকাল কার্যক্রম শুরুর আগেই মুজাহিদকে নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুরুতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এক সাক্ষীর জবানবন্দি সংযোজন এবং একটি অভিযোগের সঙ্গে সাতজন সাক্ষীর জবানবন্দি সংযোজনসংক্রান্ত রাষ্ট্রপক্ষের দুটি আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল। বেলা সোয়া ১১টার দিকে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান অভিযোগ গঠনসংক্রান্ত লিখিত আদেশ পড়া শুরু করেন।
আদেশের শুরুতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি এবং আসামিপক্ষের উত্থাপিত কয়েকটি আইনগত প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। আসামির পরিচিতিতে বলা হয়, ১৯৪৮ সালের ২ জানুয়ারি ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার পশ্চিম খাবাসপুর গ্রামে মুজাহিদ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। সেখানেই তিনি ইসলামী ছাত্র সংঘে (জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন) যোগ দেন। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ওই বছর তিনি ঢাকা জেলা ছাত্র সংঘের সভাপতি এবং আগস্ট/সেপ্টেম্বরের দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক হন। একাত্তরের অক্টোবরে তিনি ছাত্র সংঘের প্রাদেশিক সভাপতি ও আলবদর বাহিনীর প্রধান হন। ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়লাভ করেননি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি সমাজকল্যাণমন্ত্রী ছিলেন।
সাত অভিযোগ : আদেশের পরবর্তী অংশে ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ করে বন্দি রাখা, লুট, অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন ও এসব অপরাধে সহযোগিতা, প্ররোচনা, উসকানির অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল পড়ে শোনায়।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ইত্তেফাক-এর তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধে পাকিস্তানি সেনাদের এদেশীয় সহযোগীদের হাতে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের নিগ্রহের বিবরণ তুলে ধরেন। এই প্রবন্ধের বিরোধিতা করে একাত্তরের ১৬ সেপ্টেম্বর জামায়াতের মুখপত্র সংগ্রাম পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তাঁকে ‘ভারতের দালাল’ উল্লেখ করে সমালোচনা করা হয়। তিনি জামায়াত ও আলবদরের লক্ষ্যে পরিণত হন। এর জের ধরে ১০ ডিসেম্বর রাত তিনটার দিকে মুখ ঢাকা সাত-আটজন যুবক চামেলীবাগের ভাড়া বাসা থেকে সিরাজুদ্দীনকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফেরেননি, তাঁর মরদেহও পাওয়া যায়নি।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি মুজাহিদ, জনৈক হাম্মাদ মাওলানা, ৮-১০ জন অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনারা ফরিদপুরের তিনটি হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম বৈদ্যডাঙ্গি, মাঝিডাঙ্গি ও বালাডাঙ্গিতে হামলা চালায়। ওই হামলায় ৫০-৬০ জন হিন্দু নিহত হন। তাঁদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, জুনের প্রথম সপ্তাহে রাজাকাররা ফরিদপুরের রথখোলা গ্রামের রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে খাবাসপুর মসজিদের কাছ থেকে ধরে পুরাতন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত মুজাহিদের ইঙ্গিতে রাজাকার ও অবাঙালিরা তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিহারি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে জনৈক আবদুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে আটকে নির্যাতন করে। রাতে রণজিৎ পালিয়ে যান।
চতুর্থ অভিযোগ অনুসারে, ২৬ জুলাই সকালে গোয়ালচামট খোদাবক্সপুর গ্রামের জনৈক মো. আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে রাজাকাররা অপহরণ করে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে মুজাহিদ সেখানে গিয়ে এক পাকিস্তানি মেজরকে কিছু বললে ইউসুফের ওপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু হয়। তিনি সেখানে এক মাস তিন দিন আটক থেকে নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে তাঁকে যশোর সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়।
পঞ্চম অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করে, ৩০ আগস্ট রাত আটটার দিকে মতিউর রহমান নিজামীকে সঙ্গে নিয়ে মুজাহিদ নাখালপাড়ার পুরাতন এমপি হোস্টেলে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে যান। সেখানে আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল, আজাদকে দেখে তাঁরা গালিগালাজ করেন। মুজাহিদ একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন, রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে এঁদের মেরে ফেলতে হবে। ওই সিদ্ধান্ত অনুসারে মুজাহিদ তাঁর সঙ্গীদের সহযোগিতায় তাঁদের অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করেন। তাঁদের কারও মরদেহও পাওয়া যায়নি।
ষষ্ঠ অভিযোগ অনুসারে, মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে শারীরিক শিক্ষা কলেজ) পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে মুজাহিদ দলীয় নেতাদের নিয়ে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করতেন। ওই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। এ ঘটনায় মুজাহিদের বিরুদ্ধে হত্যা বা গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।

সপ্তম অভিযোগে বলা হয়, ১৩ মে বেলা দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে রাজাকার কালু বিহারি, ওহাব, জালাল ও অন্যদের সঙ্গে মুজাহিদ জিপে করে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার খলিলপুর বাজারে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে যান। সেখানে সভার পর মুজাহিদ সঙ্গীদের নিয়ে হিন্দু-অধ্যুষিত বাকচর গ্রামে হামলা চালান। বীরেন্দ্র সাহা, নৃপেণ সিকদার, সানু সাহা, জগবন্ধু মিত্র, জলধর মিত্র, সত্য রঞ্জন দাস, নরদ বন্ধু মিত্র, প্রফুল্ল মিত্র, উপেন সাহা প্রমুখকে বাঁধা হয়। মুজাহিদের নির্দেশে তাঁদের হত্যা করা হয়। রাজাকাররা এক হিন্দু নারীকে ধর্ষণ করে। মুজাহিদ ও তাঁর সঙ্গীরা অনিল সাহার বাড়ি লুট করে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে ওই পরিবার দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যায়।
অভিযোগ শোনানো শেষে ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদের কাছে জানতে চায়, তিনি দোষী না নির্দোষ। মুজাহিদ বলেন, ‘আল্লাহকে সাক্ষী রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, আমি এক শ ভাগ নির্দোষ।’ পরে তিনি কিছু বলতে চাইলে ট্রাইব্যুনাল পাঁচ মিনিট সময় দেয়। মুজাহিদ লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো পলাতক ছিলাম না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রকাশ্যে চলাফেরা করেছি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আমি ফরিদপুরে বায়তুল মোকাদ্দেম মসজিদ কমপ্লেক্স, ইয়াতিম খানা ও নারায়ণগঞ্জে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি। দেশের কোথাও আমার বিরুদ্ধে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হয়নি। অপরাধী বা অভিযুক্তের কোনো তালিকাতেই আমার নাম নেই। অপরাধ করে থাকলে এমন হওয়া মোটেও স্বাভাবিক না।’ মুজাহিদ বলেন, ‘একাত্তরে আমি ছাত্র ছিলাম। ছাত্র হিসেবে, ছাত্রসংগঠন হিসেবে আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না। তবে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছি। দেশ, জাতি, জনগণও আমাকে যথেষ্ট সম্মানিত করেছে। আমার বাড়িতে, গাড়িতে জাতীয় পতাকা দিয়েছে। তিনটি কারণে আমাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তা ঠেকানোর জন্যই ইসলামি রাজনীতি করি। নেতৃত্ব তো বটেই জামায়াতের কোনো সদস্য এ ধরনের দোষে পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে না। ৪০ বছর আগে এ কু-অভ্যাস থাকলে এখনো তা দেখা যেত। কারণ, অভ্যাস বদলায় না।’
মুজাহিদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ট্রাইব্যুনাল তা ফেরত দিয়ে সুবিন্যস্ত করে পুনর্দাখিলের আদেশ দিলে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি অভিযোগ পুনর্দাখিল করা হয়। ২৬ জানুয়ারি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ২৫ এপ্রিল এই মামলা ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালে নতুন করে অভিযোগের বিষয়ে শুনানি হয়।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Crimes against huminity, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s