কলঙ্ক মোচনের রায় : বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসি

জাতির ‘দুর্দিনে যারা শত্রুদের হাতে হাত রেখে খেলেছে করোটি নিয়ে ভুতুড়ে জ্যোৎস্নায়’ সেই নরঘাতকদের বিচার দেখার প্রতীক্ষা চার দশকের। নানা অনিশ্চয়তা, হতাশা আর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান পর্ব শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে জাতির কলঙ্ক মোচন শুরুর পর্বও। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রথম রায় ঘোষণা হয়েছে আজ সোমবার। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিচারের এ রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে; যদিও শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হতে আরো কিছু সময় লাগবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সদস্য (রুকন) আবুল কালাম আযাদের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। আযাদ পলাতক থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই এই রায় দেয় আদালত।স্থানসংকুলান না হওয়ায় আজ ট্রাইব্যুনাল-২-এর কার্যক্রম ট্রাইব্যুনাল-১-এ বসে। বেলা পৌনে ১১টায় রায় পড়া শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এ সময় ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
শুরুতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, এটা ১১২ পৃষ্ঠার একটি রায় এবং এখানে ৩৩৪টি অনুচ্ছেদ আছে।

ট্রাইব্যুনাল গত ২৬ ডিসেম্বর এক আদেশে যেকোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য নির্ধারণ করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধে কারো বিচারের এটিই হবে প্রথম রায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যদিও দালাল আইনে কিছু লোকের বিচার হয়েছিল; কিন্তু পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ওই আইন বাতিল করে সাজাপ্রাপ্ত ও কারাবন্দি দালালদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
শহীদ পরিবারসহ গোটা জাতির দীর্ঘদিনের দাবি একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচার। প্রায় ২০ বছর আগে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ বিচারের দাবিতে গঠিত হয়েছিল একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দুর্বার নাগরিক আন্দোলন শুরু হয় তখন। জাহানারা ইমাম, কবি সুফিয়া কামালের মতো নেতৃস্থানীয় অনেকেই আজ নেই। তবে তাঁদের আন্দোলনের বিজয় আজ ঘোষিত হচ্ছে এ রায়ের মধ্য দিয়ে।
১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমির ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্রসংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরে ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গড়ে ওঠে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘গণ-আদালত’-এ একাত্তরের শীর্ষস্থানীয় দালাল ও ঘাতক-সহযোগী বাহিনীর প্রধান সংগঠক গোলাম আযমের প্রতীকী বিচারের আয়োজন করে। গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণ-আদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।
১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর স্থানীয় সহযোগীদের বিচার হয়েছিল দালাল আইনে। শত বছর আগে প্রণীত সাক্ষ্য আইনে এসব বিচার সম্পন্ন হওয়ায় অনেক অপরাধী আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যায়। বিচারের এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে প্রণয়ন করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন। সেই আইনেই এখন বিচার হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম। এর আগে ২০০৯ সালের ৯ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যৌথ বৈঠকে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা ও কৌঁসুলি নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়।
জামায়াত নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, মো. কামারুজ্জামান, বিএনপির সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমসহ ১৪ জনের বিচার চলছে। আরো ১২ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সর্বপ্রথম রায়ের পর্যায়ে যায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা। কিন্তু কথিত স্কাইপ সংলাপ নিয়ে বিতর্কের এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের ফলে ওই রায় পিছিয়ে যায়। বর্তমানে সাঈদীর মামলার যুক্তিতর্ক আবার চলছে। শুনানি শেষ হলে যেকোনো দিন রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হবে। এরপর জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এ মামলার রায় ঘোষণা যেকোনো দিন হবে বলে ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে চলতি বছরের ২২ মার্চ গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বাচ্চু রাজাকারের মামলাটি দিয়েই শুরু হয় দুই নম্বর ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম।
গত ২৬ ডিসেম্বর বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে করা মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। ওই দিন ট্রাইব্যুনাল রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখে আদেশ দেয়।
গত বছর ৩ এপ্রিল বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। এরপর থেকে তিনি পলাতক। গত বছর ২৬ জুলাই তদন্ত সংস্থা বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেয়। গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। এরপর ৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল বাচ্চু রাজাকারের অনুপস্থিতিতে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। ওই সময় তাঁর পক্ষে আইনি লড়াই করতে সরকারের খরচে মো. আবদুস শুকুর খানকে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। গত বছর ৪ নভেম্বর বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Crimes against huminity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s