রাষ্ট্রপক্ষের অনেক দুর্বলতা

কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগই আনা হয়নি
দায়ী করা হয়নি সহযোগী বাহিনীর সুপিরিয়র অফিসার হিসেবেও

একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ার পেছনে প্রসিকিউশনের (রাষ্ট্রপক্ষ) অনেক দুর্বলতা সামনে আসছে। রায় ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল হক মামা ও মোজাফফর আহমদে খান তাৎণিক প্রতিক্রিয়ায় দুর্বলতার কথা বলেছেন। তবে দুর্বলতাটি ঠিক কেমন, তা বলেননি তাঁরা।

রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(২)(গ) ধারায় গণহত্যার (জেনোসাইড) কোনো অভিযোগই আনা হয়নি। শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধের [৩(২)(ক) ধারা অনুযায়ী] অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী সাজা দেওয়া হয়েছে; যদিও মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট মামলার প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমরা ৩(২)(গ) ধারায় আলাদাভাবে কোনো অভিযোগ উপস্থাপন করিনি, অভিযোগ এনেছি শুধু ৩(২) ধারায়।’ তিনি দাবি করেন, ৩(২) ধারায় সব অভিযোগই পড়ে।
কাদের মোল্লার বিচারের রায়ে বিচারকরা উল্লেখ করেছেন, ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহ, যা মানুষের বিবেককে দংশন করে, সেসব অপরাধের গভীরতার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। আমরা সতর্কতার সঙ্গে অভিযুক্ত আসামির অপরাধের গভীরতা বিবেচনায় নিয়েছি। সুতরাং আমাদের রায় অবশ্যই অপরাধের গভীরতা ও আসামির ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।’ ট্রাইব্যুনালের এ মন্তব্যের পর ঘোষিত দণ্ড দেখে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি অপরাধের গভীরতার তুলনায় এর সঙ্গে আসামির সংশ্লিষ্টতা ততটা গভীর নয়? নাকি তদন্ত প্রতিবেদন ও ফরমাল চার্জে অপরাধের সঙ্গে আসামির সংশ্লিষ্টতা ততটা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়নি? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে অভিযোগ ও স্যা-প্রমাণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের দুর্বলতা ধরা পড়েছে। এ বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ গণহত্যার (জেনোসাইড) বিষয়টিকে ব্যাপক হত্যার (mass killing) সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছে। একসঙ্গে বেশি লোক হত্যাকেই তারা বিবৃত করেছে গণহত্যা হিসেবে। অথচ ১৯৭৩ সালে পাস হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে জেনোসাইড বলতে মাস কিলিংকেই শুধু বোঝানো হয়নি; বরং কোনো জাতি, নৃগোষ্ঠী, বর্ণগত, ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা অংশবিশেষ ধ্বংস করার লক্ষে ওই জাতি বা গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা, এমনকি তাদের দৈহিক বা মানসিক ক্ষতিসাধনকেও বোঝানো হয়েছে। জেনেভা কনভেনশনেও জেনোসাইডের এ রকম সংজ্ঞাই দেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ব্যাপক হত্যা ও ধর্ষণের ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। প্রমাণিত পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগের (মিরপুরের আলোকদী গ্রামে ব্যাপক হত্যা ও ধর্ষণ) দায়ে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি তিনটি অভিযোগে তাঁকে দেওয়া হয়েছে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড। অথচ এগুলোও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ। এসব হত্যা ও ব্যাপক হত্যার দায়ে কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে–এটিই ছিল জাতির প্রত্যাশা। এর আগে বাচ্চু রাজাকার নামে পরিচিত আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে মামলায় তাঁকে সর্বোচ্চ সাজাই দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই বাচ্চু রাজাকার একাত্তরে হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী বাহিনীর কোনো বড় মাপের নেতা বা কমান্ডার ছিলেন না, ছিলেন একজন স্থানীয় পাতি নেতা। অন্যদিকে কাদের মোল্লা ছিলেন কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর হাইকমান্ডের সদস্য। ওই গোপন কমান্ডো বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিল। অথচ ওই বাহিনীর কামান্ডার বা সুপিরিয়র অফিসার (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) হিসেবে কাদের মোল্লাকে আইসিটি অ্যাক্টের ৪(২) ধারা অনুযায়ী দায়ী করা হয়নি। এটিও রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতার নিদর্শন।
রাষ্ট্রপরে অনেক দুর্বলতার বিষয় জানেন অনেকেই। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের প থেকে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন টিমকে শক্তিশালী করার দাবি জানানো হয়েছে শুরু থেকেই। এক পর্যায়ে তদন্ত সংস্থা শক্তিশালী করা হলেও তাদের সঙ্গে কোনো গবেষক রাখা হয়নি। তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, গবেষক নিয়োগের জন্য বারবার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েই কোনো ফল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে প্রসিকিউশন টিমের দু-একজন সদস্য ছাড়া অন্যদের পেশাগত জীবনে সাধারণ মামলা পরিচালনায়ও দতা দেখানোর নজির নেই। আরো একাধিক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও ফরমাল চার্জ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেগুলোতে গণহত্যা ও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। সবাই জানেন, গোলাম আযমসহ শীর্ষস্থানীয় চার আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপরে দাখিল করা ফরমাল চার্জ ট্রাইব্যুনাল প্রথম দফায় ফেরত দিয়েছিলেন সেগুলো সুবিন্যস্তভাবে লেখা না হওয়ায়। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা উল্টো প্রসিকিউটরদের সাফাই গেয়েছেন।
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপরে আরেকটি দুর্বলতা হলো, অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি দলিল উপস্থাপন না করা। এ ক্ষেত্রে তাঁদের যুক্তি, ওই সব দলিল সত্যায়িত করিয়ে আনবে কে, সেটা নাকি তাঁরা বুঝে উঠতে পারেননি।
প্রসিকিউশনের দুর্বলতার বিষয়টি সরকারের দিক থেকে স্বীকার করা না হলেও কিছুদিন যাবৎ দেখা যাচ্ছে, অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রাইব্যুনালে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন। অথচ অ্যাটর্নি জেনারেল মর্যাদার চিফ প্রসিকিউটরের তেমন কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। সম্প্রতি অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমানকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক নিয়োগ করা হয়েছে। অথচ সেখানে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মর্যাদার বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর রয়েছেন। সরকার প্রসিকিউশনের দুর্বলতা কাটাতে কিছু উদ্যোগ নিলেও তাতে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Crimes against huminity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s