সাঈদীর ২০ অপরাধ

Charges against Sayedee-1জামায়াতের  নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী ২০টি অপরাধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয় ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ওই দিন অভিযোগ গঠন করে আদেশ দেয়। সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(সি), ৩(২)(জি) এবং ৩(২)(এইচ) ধারায় এ অভিযোগ গঠন করা হয়।
সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিম্নরূপ :
১. একাত্তরের ৪ মে পিরোজপুরের সদর উপজেলার মধ্য মাছিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে জমায়েত হওয়া ২০ জন বেসামরিক বাঙালিকে হত্যা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে সাঈদী ওই জমায়েতের গোপন সংবাদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দিয়ে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(২)(এ) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন।
২. একই দিন সাঈদী তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ চালিয়ে বিজয় কৃষ্ণ মিস্ত্রি, উপেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি, সুরেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি, মতিলাল মিস্ত্রি, যজ্ঞেশ্বর মণ্ডল, সুরেন মণ্ডলসহ ১৩ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেন।
৩. একই দিন সাঈদীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায় মনীন্দ্র পসারী ও সুরেশচন্দ্র মণ্ডলের বাড়ি ধ্বংস করে। এরপর তারা কালীবাড়ি, মাছিমপুর, পালপাড়া, শিকারপুর, রাজারহাট, ডুমুরতলা, কালামতোলা, নওয়াবপুর, আলমকুঠি, ডুকিগাথি, পারেরহাট ও চিংড়াখালিতে হামলা চালায়।
৪. একই দিন সাঈদী ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় সদর থানার এলজিইডি ভবন ও ধোপাবাড়ির সামনে দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডল, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, পুলিন বিহারী ও মুকুন্দ বালাকে হত্যা করেন। এ অপরাধ আইসিটি আইনের ৩(২)(সি)(আই) ধারায় শাস্তিযোগ্য।
৫. সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করার অজুহাতে পিরোজপুরের তখনকার এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ (জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের বাবা), এসডিও মো. আবদুর রাজ্জাক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাঈফ মিজানুর রহমানসহ কয়েকজনকে ৫ মে আটক করে নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে সাঈদীর উপস্থিতিতে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি সৈন্যরা লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
৬. শান্তি কমিটির একদল লোক নিয়ে সাঈদী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ৭ মে পারেরহাট বাজারে আওয়ামী লীগ নেতা, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এবং স্বাধীনতার সমর্থকদের দোকান ও বাড়িতে হামলা চালান। সেখানে মুকুন্দ লাল সাহার দোকান থেকে ২২ সের সোনা ও রোপা লুট করেন সাঈদী।
৭. সাঈদীর নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র লোক একাত্তরের ৮ মে দুপুর দেড়টায় সদর থানার ভাদুরিয়া গ্রামে নুরুল ইসলাম খানের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নুরুল ইসলামকে ধরে নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। আগুন ধরিয়ে ধ্বংস করে দেয় ওই বাড়ি।
৮. একই দিন বিকেল ৩টায় সাঈদীর নেতৃত্বে তার সাঙ্গপাঙ্গরা পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারীর বাড়িতে হানা দিয়ে তাঁর ভাই মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহিম ওরফে কুট্টিকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে পাঁচটি বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সাঈদী চিনিয়ে দেওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ইব্রাহিমকে গুলি করে হত্যা করে। পারেরহাট বন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতেও তারা আগুন দেয়।
৯. সাঈদীর নেতৃত্বে একদল লোক ২ জুন সকাল ৯টায় নলবুনিয়ায় আবদুল হালিম বাবুলের বাড়িতে হামলা চালিয়ে বাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
১০. একই দিন সকাল ১০টায় সাঈদীর নেতৃত্বে তার সহযোগীরা উমেদপুর হিন্দুপাড়ায় চিত্তরঞ্জন তালুকদার, জহর তালুকদার, হারেন ঠাকুর, অনীল মণ্ডল, বিসাবালী, সুকাবালী, সতিশবালার বাড়িসহ ২৫টি বাড়িতে হামলা চালায়। বিসাবালীকে নারিকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে হত্যা করা হয়। সাঈদী সরাসরি ওইসব কাজে অংশ নেন।
১১. একই দিন পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটির একটি দল টেংরাখালির মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে হানা দিয়ে তাঁর ছোট ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদারকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সম্পদ লুট করে তারা।
১২. স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে একদিন সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি সশস্ত্র দল পারেরহাট বাজার হিন্দুপাড়ায় হামলা চালিয়ে হরলাল মালাকার, অরো কুমার মির্জা, তরণিকান্ত শিকদার, নন্দকুমার শিকদারসহ ১৪ হিন্দু ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে এক রশিতে বেঁধে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। গণহত্যার এই অপরাধ আইসিটি আইনের ৩(২)(সি)(আই) ধারায় শাস্তিযোগ্য।
১৩. স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর দুই-তিন মাস পর এক রাতে সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটির কিছু সদস্য ও পাকিস্তানি সৈন্যরা নলবুনিয়ায় আজহার আলীর বাড়িতে হানা দিয়ে ছেলে সাহেব আলীসহ তাঁকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। সাহেব আলীকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
১৪. যুদ্ধের শেষের দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ৫০ থেকে ৬০ জন রাজাকার হোগলাবুনিয়ায় হিন্দুপাড়ায় হামলা চালায়। সেখানে ১ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে হোগলাবুনিয়া গ্রামের মধুসূদন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে আটক করে ধর্ষণ করে। হিন্দুপাড়ায় আগুন দেয় তারা।
১৫. যুদ্ধের শেষের দিকে কোনো একদিন সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জন সশস্ত্র রাজাকারের একটি দল হোগলাবুনিয়া গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে তরণী সিকদার ও তাঁর ছেলে নির্মল সিকদার, শ্যামকান্ত সিকদার, বানীকান্ত সিকদার, হরলাল সিকদার, প্রকাশ সিকদারসহ ১০ জনকে বেঁধে গুলি চালিয়ে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেয়। এটি গণহত্যার অপরাধ।
১৬. সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জন সশস্ত্র রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যের একটি দল পাড়েরহাট বন্দরের উমেদপুরে গৌরাঙ্গ সাহার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁর তিন বোন মহামায়া, অন্যরানী ও কমলা রানীকে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে তুলে দেয়। সেখানে তাঁরা টানা তিন দিন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
১৭. স্বাধীনতা যুদ্ধকালে সাঈদী ও একদল সশস্ত্র রাজাকার বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে নিজ বাড়িতে আটকে রেখে নিয়মিত ধর্ষণ করেছে।
১৮. ভাগীরথী নামে এক নারী পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে কাজ করতেন। পাকিস্তানি বাহিনী সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দেওয়ার অজুহাতে সাঈদী তাঁকে আটক করে নির্যাতন করেন। পরে তাঁকে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেন।
১৯. স্বাধীনতা যুদ্ধকালে সাঈদী রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে মধুসূদন ঘরামী, কৃষ্ট সাহা, ডা. গণেশ সাহা, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, নারায়ণ পাল, অমূল্য হালদার, শান্তি রায়, হরি রায়, ফকির দাস, টোনা দাস, গৌরাঙ্গ সাহা, হরিদাস, গৌরাঙ্গ সাহার মা ও তিন বোন মহামায়া, অন্যরাণী ও কামাল রানীসহ ১০০ থেকে ১৫০ জন হিন্দুকে জোর করে ধর্মান্তর করেছেন।
২০. নভেম্বর মাসের কোনো একদিন সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জন রাজাকারের একটি সশস্ত্র দল ইন্দুরকানি গ্রামের তালুকদার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ৮৫ ব্যক্তিকে আটক করে। সেখানে পুরুষদের নির্যাতন এবং সেখান থেকে খগেন্দ্রনাথ সাহার মেয়ে দীপালি, স্ত্রী নিভারানী এবং রাজবল্লভ সাহার মেয়ে মায়ারানীকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাঁরা সেখানে ধর্ষণের শিকার হন।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Crimes against huminity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s