দুই বিচারের মিল-অমিল

কাদের মোল্লার বিচারের রায়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ জাতি অবশেষে স্বস্তি ফিরে পেল দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণায়। যদিও আসামি পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করছেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না। শাহবাগের গণজাগরণের প্রভাব এ রায়ে পড়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ পোষণ করেছেন সাঈদীর প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তাঁর এ সন্দেহের ভিত্তি থাক বা না থাক, এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কিছু দুর্বলতা চোখে পড়ে। রাষ্ট্রপক্ষ সাঈদীর বিরুদ্ধে ৩৮টি অভিযোগ উত্থাপন করেছিল ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করেন ২০টি। রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই ২০টি অভিযোগের মধ্যেও ১২টিই প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। এসবের মধ্যে গণহত্যার অভিযোগও রয়েছে। সাঈদীর বিরুদ্ধে ৬৮ জন সাক্ষীর তালিকা ট্রাইব্যুনালে পেশ করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ, সেই তালিকা অনুযায়ী সবাই সাক্ষ্য দেননি। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালে। বিচারপ্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে ১৪ জন সাক্ষী উধাও হয়ে যাওয়ার খবর সবারই জানা। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের একজন সাক্ষী আসামির পক্ষে সাক্ষ্য দেন। এসব ঘটনায় আগে থেকেই জনমনে শঙ্কা ছিল সাঈদীর বিচারের পরিণতি নিয়ে। জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় ওই আশঙ্কা আরো বেড়ে গিয়েছিল।
সাঈদীর মামলাটি একেবারেই ঘটনানির্ভর। ‘গ্রুপ অব ইনডিভিজুয়ালস’ এবং রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। সাঈদী যে রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন তার কোনো প্রমাণ ১৯৭১ সালে বা এর পরপর প্রকাশিত কোনো পত্রিকায় নেই। ওই সময়ের অন্য কোনো দলিলেও তার নাম পাওয়া যায় না। একাত্তরে সাঈদীর ভূমিকা সম্পর্কে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালের আগস্টে মাসিক নিপুণে। সেই প্রতিবেদনের কপিও ট্রাইব্যুনালে পেশ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্যের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়েছে। সাঈদী রাজাকার বাহিনীর স্থানীয় সদস্য ছিলেন। তবে তিনি ওই বাহিনীর কোনো পর্যায়ের কমান্ডার ছিলেন না। তাই তার ওপর কোনো সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটিও বর্তায় না। তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়েছে প্রতিটি ঘটনায় তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে। এদিক দিয়ে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলাটি অনেক সহজ ছিল। কারণ কাদের মোল্লা ছিলেন আলবদর বাহিনীর প্রভাবশালী নেতা বা কমান্ডার। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের দুর্বলতায় বিচারে ঘটল উল্টোটা।
একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় ঘোষিত হলে জাতি স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ হয়। তরুণ প্রজন্ম সেদিন রাত থেকেই অবস্থান নেয় শাহবাগ চত্বরে। শুরুতে ওই বিচার নিয়ে রাজনৈতিক আঁতাতের সন্দেহ দেখা দিলেও পরে মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের নানা দুর্বলতা ধরা পড়ে। এসবের মধ্যে গণহত্যা বা জেনোসাইডের বিষয়টি উপলব্ধি করতে না পারা এবং আসামির সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি তুলে ধরে সেভাবে অভিযোগ উত্থাপন না করার দুর্বলতা সম্পর্কে আগেই আলোকপাত করা হয়েছে। ওই রায় বিশ্লেষণ করে আরো দেখা গেছে, রাষ্ট্রপক্ষ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অর্ধশত সাক্ষীর তালিকা জমা দিলেও মাত্র ১০ জনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে সক্ষম হয়। তাঁদের মধ্যে তিনজনই আবার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নন। তাঁরা শোনা সাক্ষী (Hearsay Witnesses)। একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষের হাজির করা সাক্ষী মোমেনা বেগমের ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্য এবং একই ঘটনায় মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমির আর্কাইভে সংরক্ষিত তাঁর বক্তব্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া যায়। আসামিপক্ষ ওই বক্তব্যের ইমেজ উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালে। পাঁচ ও ছয় নম্বর অভিযোগ ছাড়া অন্যান্য ঘটনায় কাদের মোল্লার সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। ওইসব ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল সহযোগিতার (Complicity)। পাঁচ ও ছয় নম্বর অভিযোগের ঘটনায় ঘটনাস্থলে কাদের মোল্লার উপস্থিতি প্রমাণ করতে পারলেও অপরাধ সংঘটনে তার সক্রিয়তার প্রমাণ দিতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। সম্ভবত এ কারণেই ট্রাইব্যুনাল এ দুটি অভিযোগে কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে দ্বিধাবোধ করেছেন। রায়ের এক জায়গায় বলাও হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল অপরাধের সঙ্গে কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতার ধরন বিবেচনায় নিয়েছেন।
অন্যদিকে সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য ও রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সব অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে না পারলেও কয়েকটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। সাক্ষীদের বক্তব্যে অপরাধ সংঘটনে সাঈদীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। রায়ে আট ও ১০ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সাঈদীকে। আট নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সাঈদীকে। আট নম্বর অভিযোগের মীমাংসা করে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওই দিন (৮ মে, ১৯৭১) পাকিস্তানি সেনা ও স্থানীয় রাজাকাররা পারের হাট বন্দরের বাদুরিয়া ও চিখলিয়া গ্রামের অনেক বাড়ি লুটের পর আগুন দেয়। সাঈদী ও অন্য রাজাকাররা মানিক পসারির বাড়িতে হানা দিয়ে তাঁর ভাই মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহিম ওরফে কুট্টিকে ধরে রাজাকার ক্যাম্পের দিকে রওনা হন। পথে কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর মফিজ উদ্দিনকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। তবে রাতে মফিজ উদ্দিন পালাতে সক্ষম হন। তিনি কুট্টি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী এবং রাষ্ট্রপক্ষের সপ্তম সাক্ষী। তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অবিশ্বাস করার কোনো কারণ ট্রাইব্যুনাল পাননি। একাত্তরের ২ জুন বিসাবালিকে হত্যা এবং উমেদপুর হিন্দুপাড়ার ২৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ১০নং অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনজন। তাদের সাক্ষ্য পর্যালোচনায় জানা যায়, ওই দিন (২ জুন, ১৯৭১) পাকিস্তানি সেনা ও স্থানীয় রাজাকারদের নিয়ে সাঈদী উমেদপুর হিন্দুপাড়ায় লুটপাট চালানোর পর প্রায় ২৫টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। রাজাকাররা বিসাবালিকে নারিকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করে। পরে সাঈদীর উসকানিতে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের পঞ্চম সাক্ষী মাহতাবউদ্দিন হাওলাদার এবং নবম সাক্ষী আলতাব হোসেন হাওলাদার ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁদের বর্ণনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, হত্যাকাণ্ডে সাঈদীর সংশ্লিষ্টতা ছিল। অগ্নিসংযোগের কারণ দেখে বোঝা যায়, ওই হামলা ছিল পূর্বপরিচালিত।
এ কথা ঠিক, সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাক্ষী নিখোঁজ হওয়া, কোনো কোনো সাক্ষীর ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আসামির পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা না ঘটলে এ মামলার পরিণতি নিয়ে জনমনে কোনো সংশয় বা সন্দেহ দেখা দিত না। সাক্ষীদের এ রকম ভূমিকা নেওয়ার পেছনে তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা, আসামিপক্ষ থেকে নানা রকম প্রলোভন ও ভয় দেখানোর ঘটনা কাজ করেছে বলে জানা যায়। কিন্তু সাক্ষীদের নিরাপত্তা দিতে সরকারের কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। আসামিপক্ষ থেকে সাক্ষীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে একাধিক জিডিও করা হয়েছে। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। সাক্ষী সুরক্ষা আইন থাকলে এমনটি ঘটত না। সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে অনীহার পেছনে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের একটি প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা ছিল বলেও কারো কারো অভিযোগ আছে। সরকারি দলের এক প্রভাবশালী নেতাকেও রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে একেকবার একেক রকম তথ্য দিতে দেখা গেছে। এসব ঘটনা খুবই দুঃখজনক। বিভিন্ন মহল থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও এখনো সাক্ষী সুরক্ষা আইন না করাটা হতাশাব্যঞ্জক। পরবর্তী মামলাগুলোর ক্ষেত্রে যেন এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু না ঘটে সে বিবেচনায়ই বিষয়গুলো নতুন করে সামনে আনা প্রয়োজন।
সরকার ও রাষ্ট্রপক্ষের নানা দুর্বলতার কারণেই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলায়ও সব সাক্ষীকে হাজির করা যায়নি বলে অভিযোগে আছে। এসব দুর্বলতা দূর করা এবং আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার এখতিয়ারও রহিত করা জরুরি। এজন্য তরুণ প্রজন্মের দাবি অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে হবে। গণজাগরণের চাপে সরকার সম্প্রতি অপর্যাপ্ত সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ সৃষ্টি এবং সংগঠনের বিচার করার বিধান যুক্ত করে আইন সংশোধন করেছে। কিন্তু এ সংশোধনই যথেষ্ট নয়। সংগঠনের বিচার করতে হলে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদও সংশোধন করতে হবে। না হলে জটিলতা থেকেই যাবে।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh, Crimes against huminity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s