হেফাজতি তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড ঢাকা : কুরআন শরিফও ভস্মীভুত

BSS_14_06.05.2013হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা গতকাল রবিবার বিকেল থেকে শেষরাত পর্যন্ত রাজধানীর মতিঝিল, নয়াপল্টন, বায়তুল মোকাররম, দৈনিক বাংলা মোড় ও ফকিরাপুল এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। তাঁদের তাণ্ডবে ওই এলাকাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গতকাল হেফাজতের কর্মীরা পল্টন মোড় থেকে দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত দুই পাশে ফুটপাতের সব দোকান পুড়িয়ে দিয়েছে। পুড়িয়ে দিয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেট। রাংগস টাওয়ারে অবস্থিত কেএফসি, রবি ও দৈনিক ‘সকালের খবর’ এবং মুক্তি ভবনে সিপিবির কার্যালয় ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে তাঁরা। হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন, আজাদ প্রোডাক্টস, আইডিয়াল প্রোডাক্টের শোরুমে আগুন দেওয়া হয়েছে। জনতা ব্যাংক কর্পোরেট অফিসসহ তিনটি এটিএম বুথ ভাঙচুর ও বেশ কয়েকটি গাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে হেফাজতের নেতা-কর্মীরা। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ ফটকে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে প্রায় ১১টি দোকান, যেখানে কুরআন-হাদিসসহ ধর্মীয় পুস্তকই বিক্রি হতো। এখন রাস্তার ওপর স্তূপাকারে পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া হাজার হাজার কুরআন-হাদিসের অংশবিশেষ। ইসলামের ‘হেফাজতের’ কথা বলে কুরআন-হাদিস গ্রন্থ পুড়িয়ে দেওয়ায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা ধিক্কার জানাচ্ছেন হেফাজতিদের। তারা সড়ক বিভাজকগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সড়কের পাশে ও মাঝে থাকা শতাধিক গাছ কেটে ফেলেছে। গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, সড়ক বিভাজক দিয়ে তারা পল্টন মোড় থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে।
গত রাতের নারকীয় সেই তাণ্ডবের বর্ণনা দিতে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটের সামনের ফুটপাতের দোকানদার ইব্রাহিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এমন তাণ্ডব দেখিনি আগে। আমার সব কিছুই শেষ। পুঁজি তো হারাইছি, ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করমু জানি না।’কান্নাভেজা কণ্ঠে ইব্রাহিম জানান, দুটি দোকানে দীর্ঘদিন ধরে নামাজের টুপি, তসবিহ, জায়নামাজ বিক্রি করতেন তিনি। প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মালামাল ছিল দোকানে। কিন্তু গতকাল সবই পুড়িয়ে দিয়েছে হেফাজতের কর্মীরা। গত রাতের নারকীয় সেই তাণ্ডবের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা দুপুরবেলা থেকেই দোকানের কাছে আসতে পারিনি। কখনো হেফাজতের কর্মীরা, কখনো পুলিশ আমাদের বাধা দেয়। রাতে যেভাবে সব পুড়েছে, তখন জান বাঁচানোই ফরজ মনে করেছি।’ইব্রাহিমের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ গেটে প্রায় ৩০টি দোকান পুড়েছে। যেখানে আগুন থেকে কোরআন শরিফ, জায়নামাজ, টুপি, তসবিহ কোনো কিছুই বাদ যায়নি। বায়তুল মোকাররম ফুটপাত দোকান মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ শামীম খান জানান, প্রায় ৩০০ দোকান আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। প্রতিটি দোকানে প্রায় ছয় লাখ টাকার জিনিসপত্র ছিল। অনেক মালিক তাঁদের দোকানে নগদ টাকাও রেখেছিলেন।
ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে বায়তুল মোকাররমের স্বর্ণের দোকানও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সেখানকার নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, নিচে ১০টি স্বর্ণের দোকানে আগুন লাগে। পরে দোতলায় চারটি স্বর্ণের দোকানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পুড়ে যাওয়া ফেমাস জুয়েলার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফছার হোসেন মৃধা বলেন, ‘আমরা দোকানের শাটার খুলতে পারছি না। খোলা গেলে পরিস্থিতি বুঝতে পারব।’
আজ সোমবার ভোরে রাজধানীর বিজয়নগর, পল্টন, মতিঝিল এলাকায় যারা গেছেন তাদের মনে হয়েছে, রাতে সেখানে টর্নেডো বয়ে গেছে। রাস্তায় ও আশপাশে পড়ে আছে আস্ত গাছ ও গাছের ডালপালা। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা গাছ সরানোর কাজ করছেন। পল্টন-বিজয়নগর সড়কের বিভাজকের ওপর যে গাছগুলো ছিল, এর অনেকগুলোই নেই।
কোনো টর্নেডো নয়, হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির নামে রাতভর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ওই এলাকা। পল্টন মোড়ে প্রীতম হোটেলের সামনে থেকে বিজয়নগর মোড় পর্যন্ত এলাকায় ছোট-বড় অন্তত ৭০টি গাছ কাটা হয়েছে। সেখানে ১৫ বছরের পুরোনো অনেক গাছও ছিল, যেগুলো কাটা হয়েছে করাত দিয়ে। উপড়ে ফেলা হয় অনেক ছোট গাছ।
রাজধানীর ওই রাস্তাতেই কিছু মাঝারি আকারের গাছ ছিল। ইট-পাথরের ঢাকার পল্টন-মতিঝিল এলাকার প্রাণ ছিল এই গাছগুলো। অথচ গতকাল বিকেল থেকে গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করে আগুন জ্বালিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে হেফাজতের কর্মীরা। বিজয়নগর মোড় দখলে নিয়ে তারা মধ্যরাত পর্যন্ত চালায় তাণ্ডব।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে নির্বিচারে গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তাণ্ডব চালিয়েছিল, এর সঙ্গে গতকালের কর্মকাণ্ডের অনেক মিল দেখা গেছে। অবরোধের নামে সে সময় দেশের ১০টি জেলার প্রধান সড়কের পাশে প্রায় ২০ হাজার গাছ ধ্বংস করে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা।
আজ সকাল থেকে নয়াপল্টন, দৈনিক বাংলা মোড়, ফকিরাপুল, মতিঝিলের শাপলা চত্বর, পল্টন মোড়ের সড়কে ইটের স্তূপ, গাছপালা ও বিদ্যুতের পড়ে থাকা খুঁটি সরানোর কাজ করছেন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যৌথভাবেই পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s