কলঙ্ক মোচনের আরেক রায় কাল : এবার পালা আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠক কামারুজ্জামানের

Dainik Bangla 31-12-71মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কামারুজ্জামানকে আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলায় ‘আরো ১৫ জন দালাল গ্রেফতার’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে সরকারি তথ্য বিবরণীর বরাত দিয়ে অন্যদের সঙ্গে কামারুজ্জামানের গ্রেপ্তার হওয়ার খবরটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে কামারুজ্জামানকে শেরপুরের আলবদর হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হবে। আজ বুধবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ কথা জানান।
দুটি ট্রাইব্যুনাল এরইমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলার রায় দিয়েছে। এর মধ্যে গত ২১ জানুয়ারি প্রথম রায়ে মুক্তিযুদ্ধকালের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সাবেক সদস্য (রুকন) পলাতক আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয় ২ নম্বর ট্রাইব্যুনাল। ৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে একই ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ আপিল করায় তা আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি এক নম্বর ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল হয়েছে।
কামারুজ্জামানের জন্ম ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই তখনকার ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার শেরপুর থানা সদরে। তাঁর বাবার নাম ইনসান আলী সরকার (প্রয়াত) এবং মায়ের নাম সালেহা খাতুন। শেরপুরে জি কে এম ইনস্টিটিউশনে দশম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন কামারুজ্জামান। এসএসসি পাস করার পর তিনি জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে ভর্তি হন। সেখানে স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের হল শাখার সেক্রেটারি ছিলেন। ওই কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাহিত্য সম্পাদক পদে প্রার্থীও হয়েছিলেন তিনি। তবে নির্বাচনে জিততে পারেননি।
১৯৭০ সালে কামারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার প্রধান হন। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিল মাসে জামালপুরে প্রথম যে আলবদর বাহিনী গড়ে ওঠে, তার প্রধান সংগঠক ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই এক মাসের মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার সব ছাত্রসংঘকর্মীকে আলবদর বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ৪ জুন বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ অভিযোগ গঠন করে আদেশ দেন। এসব অভিযোগের মধ্যে আছে একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি।
ট্রাইব্যুনালের ওই আদেশে বলা হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কামারুজ্জামান বৃহত্তর ময়মনসিংহে আলবদরের প্রধান সংগঠক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ও সহযোগিতায় আলবদর বাহিনী ও পাকিস্তানি সেনারা ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর প্রভৃতি এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করে। এরপর ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ পড়ে শোনান।
বদিউজ্জামানকে হত্যা : প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ২৯ জুন শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী থানার কালীনগর গ্রামে ফজলুল হকের ছেলে বদিউজ্জামানকে রামনগর গ্রামের আহম্মদ মেম্বারের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। এরপর তাঁকে নির্যাতন করে আহম্মদনগরের রাস্তার ওপরে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে লাশ টেনে নিয়ে কাছাকাছি কাঠের পুলের নিচে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
প্রভাষক আব্দুল হান্নানকে নির্যাতন : একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি এক দুপুরে শেরপুর কলেজের তৎকালীন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ আব্দুল হান্নানকে খালি গায়ে মাথা ন্যাড়া করে, গায়ে ও মুখে চুনকালি মাখিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে উলঙ্গ অবস্থায় চাবুক দিয়ে পেটাতে পেটাতে শেরপুর শহর ঘোরায় আসামি কামারুজ্জামান ও তাঁর সহযোগীরা।
সোহাগপুরে গণহত্যা : একাত্তরের ২৫ জুলাই ভোরবেলায় কামারুজ্জামানের পরিকল্পনা ও পরামর্শে রাজাকার, আলবদরসহ পাকিস্তান সেনাবাহিনী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে। এরপর তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১২০ জন পুরুষকে ধরে এনে হত্যা করে। ধর্ষণের শিকার হন গ্রামের মহিলারা।
গোলাম মোস্তফাকে হত্যা : ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট মাগরিবের নামাজের সময় গোলাম মোস্তফা তালুকদারকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। কামারুজ্জামানের নির্দেশে তাঁকে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে বসানো আলবদর ক্যাম্পে রাখা হয়। মোস্তফার চাচা তোফায়েল ইসলাম এরপর কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে তাঁর ভাতিজাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু ওই রাতে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা গোলাম মোস্তফা ও আবুল কাশেম নামের আরেক ব্যক্তিকে মৃগী নদীর ওপর শেরি ব্রিজে নিয়ে গুলি করে। গুলিতে গোলাম মোস্তফা নিহত হলেও হাতের আঙুলে গুলি লাগায় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান আবুল কাশেম।
লিয়াকতসহ আটজনকে হত্যা : একাত্তরে রমজান মাসের মাঝামাঝি সময়ে এক সন্ধ্যায় শেরপুরের চকবাজারের বাসা থেকে মো. লিয়াকত আলী ও আরো ১১ জনকে আটক করে ঝিনাইগাতী আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। এরপর তিনজন ছাড়া বাকি সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলি করার সময় আসামি কামারুজ্জামান ও তাঁর সহযোগী কামরান সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
দিদারসহ কয়েকজনকে নির্যাতন : একাত্তরের নভেম্বর মাসে দিদারসহ কয়েকজনকে ময়মনসিংহ শহরের জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী। পাকিস্তানের পে বক্তব্য দিতে বাধ্য করতে সেখানে নির্যাতন চলে তাঁদের ওপর।
দারাসহ ছয়জনকে হত্যা : মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৭ রোজার দিন দুপুরে ময়মনসিংহ শহরের গোলাপজান রোডে টেপা মিয়ার বাড়ি ঘেরাও করে আলবদর বাহিনী টেপা মিয়া ও তাঁর বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় আলবদর ক্যাম্পে। পরদিন কামারুজ্জামানের নির্দেশে টেপা মিয়া ও দারাসহ সাতজনকে ব্রহ্মপুত্রপারে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। টেপা মিয়া বেঁচে গেলেও অন্যরা প্রাণ হারান।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh, Crimes against huminity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s