সত্যকে মিথ্যা প্রমাণ করার নিষ্ফল চেষ্টা সাকার

S Q injuredমুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশে ছিলেন না- এ কথা প্রমাণ করার হাজারো চেষ্টা করেছেন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী)। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে সাকার সেই কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। সাকা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন বলে প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে তাঁর উপস্থিতির বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে গিয়েও একাত্তরে দেশে না থাকার প্রমাণের কসরত করেন বিএনপির এই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা, যাঁকে একাত্তরে প্রত্যক্ষভাবে নির্যাতন চালাতে দেখার কথা ট্রাইব্যুনালে বলেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কয়েকজন সাক্ষী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাফাই সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সাকা চৌধুরী বলেন, একাত্তরের ২৯ মার্চ বিকেলে করাচির উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি। অক্টোবর পর্যন্ত পাকিস্তানে থেকে তারপর লন্ডন চলে যান এবং ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যেই ছিলেন। তিনি আরো বলেন, ২৯ মার্চ তাঁকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন তাঁর চাচাতো ভাই কাইয়ুম রেজা চৌধুরী। সন্ধ্যায় তিনি করাচি বিমানবন্দরে নামলে তাঁকে নিতে আসেন তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধু মুনীব আর্জুমান্দ খান এবং মাহমুদ হারুনের (ডন গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের কর্ণধার) ব্যক্তিগত সহকারী। করাচিতে তিন সপ্তাহ অবস্থানকালে মাহমুদ হারুনের বাড়িতে ছিলেন বলে জানান সালাহউদ্দিন কাদের। তিনি বলেন, করাচিতে থাকার সময় নিজাম আহমেদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরী, আরিফ জিওয়ানি, ওসমান সিদ্দিক ও রেজাউর রহমানের সঙ্গে তাঁর চলাফেরা ছিল। তিনি বলেন, ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রান্সফার নিয়ে মে মাসে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। তখন নটর ডেম কলেজে পড়াকালীন বন্ধু হাসনাইন খুরশেদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় এবং দুজনই দীর্ঘসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে কাটাতেন। সাকা বলেন, একাত্তরের আগস্ট মাসে তিনি মারিতে বেড়াতে যান এবং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তিনি লাহোরে ফিরে আসেন।
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সদস্যরা ২০১০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে গিয়ে সাকা চৌধুরীর অপরাধের তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করেন। ওই দিন সাকা চৌধুরী চট্টগ্রাম শহরে তাঁর বাসা গুডস হিলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, তদন্তকারীরা যা বলছেন তার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ একাত্তরের এপ্রিলেই তিনি পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন। এ সংবাদ তখন প্রচারিত হয় দেশ টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি দাবি করেন, এপ্রিলের প্রথম দিকে তিন পাকিস্তান চলে যান। আবার ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, ২৯ মার্চ তিনি বিমানে উঠেন পাকিস্তানের উদ্দেশে। তাহলে কোন তথ্য সঠিক?

এদিকে সালাহউদ্দিন কাদেরের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক বিচারপতি শামীম হাসনাইন। ট্রাইব্যুনালে সালাহউদ্দিন কাদেরের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতিকে গত ২২ জুলাই লেখা চিঠিতে বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী সাফাই সাক্ষী হিসেবে আমার নাম দিয়েছেন। আমি স্বীকার করছি যে, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সহপাঠী থাকায় আসামিপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আমার নাম দেওয়া হয়েছে। সালাহউদ্দিন কাদের ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছিলেন। আমার কয়েকজন সহকর্মী বিচারপতি বলেছেন, আমি হাইকোর্ট বিভাগের একজন বর্তমান বিচারপতি হওয়ায় কোনো আদালতে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। একদিকে পেশাগত বিধি মানার বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে বিবেকের দায় আমার মধ্যে কাজ করছে। এ অবস্থায় আমি আপনার পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত চাইছি। এ বিষয়ে আপনার যে কোন সিদ্ধান্তে আমার সম্মতি থাকবে।’ কিন্তু প্রধান বিচারপতি তার আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। বিচারপতির এই বক্তব্য সঠিক ধরে নিলেও প্রশ্ন দেকা দেয়, মে মাসের আগে এবং আগস্টের পরে সাকা কোথায় ছিলেন?
সাকা চৌধুরী যে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশেই ছিলেন এবং সেপ্টেম্বরে মুক্তিবাহিনীর অভিযানে আহত হয়েছিলেন তার প্রমাণ আছে একাত্তরের এসবি রিপোর্টে এবং পাকিস্তানের পত্রিকা সংবাদে। একাত্তরের এপ্রিলে সাকা বিমানে করে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন বলে তাঁর পক্ষের সাফাই সাক্ষীরাও বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা তিনি সেখানে ছিলেন- এমন তথ্য-প্রমাণ তাঁরা দেখাতে পারেননি। এটা ঠিক যে, তৎকালীন পাকিস্তান মুসলিম লীগের (কনভেনশন) সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সাকা চৌধুরীর পক্ষে ওই সময় সপ্তাহে দু-একবার করে পাকিস্তানে যাওয়া-আসা করাটা কোনো ব্যাপারই ছিল না। প্রকৃত ঘটনা রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালকে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার দাবিদার সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বর্বর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁকে হত্যা করার জন্য তিনবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। প্রতিবারই তিনি বেঁচে যান। তবে শেষবারের অভিযানে তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। নিহত হয়েছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ির চালক। মুক্তিবাহিনীর ওই অভিযানে সাকার মৃত্যুর খবর রটে গিয়েছিল। পরে পাকিস্তান টাইমস, বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকার খবরে তাঁর আহত হওয়ার কথা জানা যায়। লাহোরের পাকিস্তান টাইমসে সংবাদটি পরিবেশিত হয়েছিল পিপিআইয়ের বরাত দিয়ে। পাকিস্তান টাইমসের বরাত দিয়ে পরে ওই সংবাদ প্রকাশ করে দৈনিক পাকিস্তানও।
‘বোমার আঘাতে ফজলুল কাদেরের ছেলে আহত : গুলিতে ড্রাইভার নিহত’ শিরোনামে ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখে দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কনভেনশন মুসলিম লীগ প্রধান ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলের ওপর হামলা চালালে তিনি আহত হন। গত ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে এ ঘটনা ঘটে। গত শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১) রাতে ঢাকায় জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী এ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, যে গাড়িতে তাঁর ছেলে ছিল সে গাড়ির ড্রাইভার ওই হামলার ফলে নিহত হয়েছে।’
দৈনিক পাকিস্তানের ওই সংবাদে ফজলুল কাদের চৌধুরীর আহত ছেলের নাম উল্লেখ না করা হলেও তখনকার পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো এক গোপন রিপোর্টে উল্লেখ আছে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধাদের ওই অভিযানে আহত হন। ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ইস্ট পাকিস্তান ফর দ্য সেকেন্ড হাফ অব সেপ্টেম্বর ১৯৭১ শীর্ষক ওই রিপোর্টে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ আছে।
চট্টগ্রামের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বছরতিনেক আগে জানান, ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে সাকা চৌধুরী বিয়ে করে অনুষ্ঠান থেকে বের হওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। এর আগে জুলাই ও আগস্টে মুক্তিযোদ্ধারা নগরীর গুডস হিলের সামনে সাকা চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিলেন। সর্বশেষ হমলায় আহত হয়ে সাকা চৌধুরী উন্নত চিকিৎসার জন্য সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে লন্ডন যান। ১৯৭৫ সালে পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশে ফিরে আসেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বশেষ হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এস এম মাহবুব-উল-আলম। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, হত্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাকা চৌধুরীর গতিবিধির ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধারা। এর মধ্যে খবর আসে, সেপ্টেম্বর মাসের কোনো এক বৃহস্পতিবার দেওয়ানবাজার এলাকার বাসিন্দা ডা. ছমিউদ্দিনের মেয়ের সঙ্গে সাকা চৌধুরী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন। তবে ছমিউদ্দিনের মেয়ে এ বিয়েতে রাজি নন। এক প্রকার জোর করেই তাঁকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাই ডা. ছমিউদ্দিনের ছেলে আজিজ এগিয়ে আসেন মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে। মাহবুব-উল-আলমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক ভুঁইয়া ও শচীন্দ্রনাথ সেন ওরফে কামাল তখন হামলার প্রস্তুতি নেন। ঘটনার দিন বিকেল ৫টায় তিনজন মুক্তিযোদ্ধা গ্রেনেড, স্টেনগান ও রিভলবার নিয়ে অবস্থান নেন চন্দনপুরা পেচুমিয়া গলির ড্রেনে। সন্ধ্যা ৬টায় সাকা চৌধুরী গাড়িতে ওই বাসায় যান। আকদ পর্ব শেষ করে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে সাকা চৌধুরী গাড়ি নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে এলে পরিকল্পনা অনুযায়ী আজিজ সংকেত দেন টর্চ জ্বালিয়ে। মুক্তিযোদ্ধারা গাড়ি লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলার পাশাপাশি গুলিবর্ষণ শুরু করেন। সাকা চৌধুরী মারা গেছেন মনে করে মুক্তিযোদ্ধারা বাড়ি ফিরে যান।
এসব তথ্য-প্রমাণ ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপিত হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সাকা চৌধুরীর দেশে না থাকা প্রমাণ করার সব চেষ্টা বিফলে গেল। রায়ে বলা হয়েছে, সাকা চৌধুরী নিজে উপস্থিত থেকে যে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, তার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী রয়েছে। সাক্ষীদের বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য। রায়ে ভয়েস অব আমেরিকার খবরে তাঁর আহত হওয়ার কথা জানা যায়। লাহোরের পাকিস্তান টাইমসে সংবাদটি পরিবেশিত হয়েছিল পিপিআইয়ের বরাত দিয়ে। পূর্ব পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলা হয়, এসব প্রমাণ করে, সাকা একাত্তরে চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন।
রায়ে আরো বলা হয়, সাকা চৌধুরী তাঁর গুডস হিলের টর্চার সেলে উপস্থিত হয়ে ও বিভিন্ন স্থানে হাজির থেকে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর নির্যাতন করেছেন, তার বর্ণনা দিয়েছেন ১৪ জন সাক্ষী। এ ছাড়া নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষী (২৭ নম্বর সাক্ষী) ডা. শফিউল্লাহর সাক্ষ্য বিশ্বাস করে ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করেন, সাকা চৌধুরী একাত্তরে দেশে ছিলেন তা প্রমাণিত। ডা. শফিউল্লাহ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে সাকা চৌধুরী আহত হয়ে ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh liberation war, Crimes against huminity, War crimes

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s