স্কাইপ কেলেঙ্কারির তদন্ত না হওয়ায় নতুন কেলেঙ্কারি

বছর খানেক আগে ‘স্কাইপ কেলেঙ্কারি’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে। এক নম্বর ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের সঙ্গে প্রবাসী আইন বিশেষজ্ঞের কথোপকথন গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর দাবি উঠেছিল, ওই কথোপকথন ফাঁস হওয়ার নেপথ্যে কারা জড়িত, তা অনুসন্ধান করা হোক। কিন্তু এ নিয়ে তদন্তের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। সরকারি মহল থেকে ধরেই নেওয়া হয়েছিল, ওই কথোপকথন ফাঁস হয় দেশের বাইরে থেকে। যদিও তখন বিচারপতি নিজামুল হকের কম্পিউটারও হ্যাক করা হয়েছিল। হ্যাক করা ইমেইলসহ বিভিন্ন তথ্য তখন ফাঁস করা হয় ট্রাইব্যুনাল লিকস নামের একটি ব্লগে, যেটিতে এবারও ফাঁস করা হলো সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার রায়ের খসড়া। এ থেকে ধারণা করা যায়, দুটি ঘটনাই একই মহল ঘটিয়েছে। কাজেই আগের ঘটনাটির বিষয়ে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিলে এবারের ঘটনা সংঘটিত করা কঠিন হতো।

আগেরবার বিচারক ও প্রবাসী আইন বিশেষজ্ঞের ফাঁস হওয়া কথোপকথনে একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও বিচারক সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য ছিল। এ নিয়ে তখন সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কথাবার্তায় এক নম্বর ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও প্রবাসী আইন বিশেষজ্ঞদের প্রতি অসন্তোষ লক্ষ্য করা গেছে। একই কারণে সরকারের সব পর্যায়েরই ওই দুই জনের প্রতি বিরূপ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ফলে এক নম্বর ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ আর প্রবাসী আইনজ্ঞের প্রতি রুল জারির মধ্য দিয়ে সব ক্ষোভ-অসন্তোষের প্রশমন হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় না আনার এটাও সম্ভবত একটা কারণ। তবে সেই ঘটনায় সরকারের নির্লিপ্ততার পরিণতি যে শুভ হয়নি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আজ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা, ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করেন, স্কাইপ কথোপকথন কারা কীভাবে ফাঁস করল, তা নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে আলাদাভাবে জোরালো তদন্ত হওয়া উচিত ছিল। স্কাইপ কথোপকথন ফাঁসের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলে রায়ের খসড়া ফাঁসের মতো ঘটনা ঘটত না। যে দুষ্টচক্র ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার জন্য এসব ফাঁসের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছে, তাদের দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হতো।’
এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ওই পত্রিকাটিকে বলেন, ‘এটা সত্যি, স্কাইপ কথোপকথন ফাঁস হওয়ার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা গেলে রায়ের খসড়া ফাঁস হওয়ার মতো ঘটনা না-ও ঘটতে পারত।’ প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সদস্য সানাউল হক।
ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবদনে বলা হয়, স্কাইপ কেলেঙ্কারির মুখে পদত্যাগের পর বিচারপতি নিজামুল হক তাঁর বাসভবনের যে কক্ষে বসে কম্পিউটারের মাধ্যমে স্কাইপে কথা বলতেন, সে কক্ষটি প্রায় এক-দেড় মাস তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন, যাতে তদন্তকারীরা ওই কম্পিউটার থেকে আলামত সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু কোনো তদন্ত কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আজ পর্যন্ত সেখানে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেননি বা এ বিষয়ে জানতে চাননি।’
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “এক বছর পর আবারও ট্রাইব্যুনাল ঘিরে আলোচনা। এবারের বিষয়—বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার ‘রায়ের খসড়া ফাঁস’। এবার অবশ্য ট্রাইব্যুনালের সাধারণ ডায়েরির (জিডি) পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্কাইপ কেলেঙ্কারির তদন্ত হলে আবারও একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না।”
‘স্কাইপ সংলাপ ফাঁস : সরকারের নীরবতা রহস্যময়’ শিরোনামে গত বছর ডিসেম্বরে লিখেছিলাম, ‘টেলিফোনে আড়ি পেতে সংবাদ সংগ্রহের অপরাধে গত বছর (২০১১ সালে) বন্ধ করে দেওয়া হয় যুক্তরাজ‌্যের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড। ট্যাবলয়েড সাইজের এ পত্রিকাটি এক সময় ছিল বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রিত ইংরেজি দৈনিক। এর সম্পাদকও ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর খুবই ঘনিষ্ঠ। সম্প্রতি আমাদের দেশে আরো জঘন্য অপরাধ করেছে আমার দেশ নামের একটি পত্রিকা।একজন প্রবাসী গবেষকের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব‌্যুনাল-১-এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের কথিত স্কাইপ সংলাপ প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি বেশ কয়েকদিন আগে ধারাবাহিকভাবে। কিন্তু সরকার এখনো পত্রিকাটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দেশের নাগরিক সমাজকেও এ বিষয়ে যথেষ্ট সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই বরং বেশি ব্যস্ত প্রবাসী গবেষকের সঙ্গে কথা বলে বিচারক কতটা আইন লঙ্ঘন করেছেন সে বিষয়ে মুখরোচক আলোচনায়। আর এই সুযোগে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তরা ট্রাইব্যুনালে একের পর এক বিচার নতুন করে শুরু করার আবেদন জানিয়ে কালক্ষেপণ করছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিলে এই কালক্ষেপণের সুযোগ মিলত না।’

Advertisements

Leave a comment

Filed under Bangladesh, Corruption, Trial of crimes against huminity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s