গণহত্যাকারীদের নিয়ে কেন এ মায়াকান্না?

একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের চলমান বিচার প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত আটটি মামলার রায় হয়েছে। এ বিচারের লক্ষ্যে গঠিত দুটি ট্রাইব্যুনাল পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন কারদণ্ড, একজনকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড এবং আরেকজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন। এদের মধ্যে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার সাজা যাবজ্জীবন থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক নেতা আবদুল আলীমের মৃত্যুদণ্ড না হলেও দুটি মামলার রায়েই ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, তাদের অপরাধও মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। তবে আসামিদের বয়স ও স্বাস্থ্য বিবেচনায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ রায়টি হয়েছে গত বুধবার আলীমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়। আর সেদিনই মৃত্যুদণ্ড প্রথা বিলোপ করতে বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ১০ অক্টোবর ইইউ মৃত্যুদণ্ডবিরোধী দিবস পালন করেছে। এই দিবস উপল্েয সেদিন বাংলাদেশে ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান উইলিয়াম হানা ও ইইউ সদস্য আটটি দেশের রাষ্ট্রদূতরা গণমাধ্যম সম্পাদকদের উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে এ দেশেও মৃত্যুদণ্ড বিলোপ হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। গত জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ইইউ তার মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অবস্থান তুলে ধরে ওই রায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। কাজেই মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ কিংবা সমালোচনা করাটা তাদের নৈতিকতার মধ্যেই পড়ে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই আইনে গুরুতর অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়। আর বাংলাদেশে কেবল একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়েই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে এমন নয়, প্রচলিত ফৌজদারি আইনের আওতায় সাধারণ হত্যাকাণ্ডের দায়েও হরহামেশা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে মামলার রায় যেদিন হয়েছে, সেদিনও নেত্রকোনার একটি আদালত চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এক ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে। কাদের মোল্লাকে যেদিন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, সেদিনও এক জেলায় একটি হত্যা মামলার রায়ে একাধিক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড দেন স্থানীয় আদালত। সেসব েেত্র কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এতটা বিচলিত হতে দেখা যায়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তবু মৃত্যুদণ্ডের বিপে কথা বলার নৈতিক জোর আছে। কিন্তু অন্য যেসব দেশ ও সংস্থা একাত্তরের গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে শোরগোল তুলছে, তাদের মতলবটা আসলে কী? ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র থাকার ভুয়া অজুহাতে ইরাকে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে সাজানো বিচারে মৃত্যুদণ্ড দিল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। তারাও যখন বাংলাদেশে গণহত্যাকারীদের নিয়ে মায়াকান্না করে তখন বুঝতে বাকি থাকে না ‘ডালন মে কুচ কালা হ্যায়’।
একাত্তরের গণহত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ডের সবচেয়ে বড় সমালোচক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গোলাম আযম ও কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়া সত্ত্বেও রায় দুটির সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি। যদিও সংস্থাটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশ ও মহলের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে পপাতমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করার অভিযোগ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে এ রকম অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ঠেকাতে বা নিদেনপে বিশ্বমহলের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তৎপর একটি গোষ্ঠী দেশে বিদেশে অঢেল অর্থ ছড়াচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের একটি লবিস্ট প্রতিষ্ঠানকেই তারা দিয়েছে হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও ব্রিটেনের টবি ক্যাডম্যান ও সৌদি আরবের আল-গামদিসহ আরো অনেককে অপরাধীদের পে নামানো হয়েছে বিচারের শুরু থেকেই। কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়েই হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা একাত্তরের ঘাতকদের ‘মানবাধিকার’ নিয়ে মায়াকান্না করছে বলে নানা মহল থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে।

Advertisements

Leave a comment

Filed under Trial of crimes against huminity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s